কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা হাতে দেখা গেল ৭১ বছর বয়সী আবু বক্করকে। ভেড়ামারার ফকিরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে লালনের আখড়াবাড়িতে আসছেন। তাঁর গুরু ছিলেন ভেড়ামারার গোলাপনগরের সোলেমান শাহ, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। জীবিত থাকাকালীন সোলেমান শাহ ভেড়ামারা থেকে নৌকায় করে লালন ধামে আসতেন। গুরুর সেই পথ অনুসরণ করেই আবু বক্করও পাঁচ দশক ধরে এই পবিত্র স্থানে ছুটে আসছেন। আবু বক্কর বলেন, “এখানে না এলে মন বাড়িতে টেকে না”।

আবু বক্করের কাছে ছেঁউড়িয়া কেবল একটি তীর্থস্থান নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের আত্মিক টান এবং গুরুর স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক বিশেষ ঠিকানা। সময়ের সাথে সাথে আয়োজনের পরিধি বেড়েছে এবং পরিবেশ বদলেছে, তবে আখড়াবাড়িতে আসার আকর্ষণ তাঁর মনে বিন্দুমাত্র কমেনি।

আজ শনিবার বিকেল থেকে কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবসের তিন দিনের বিশেষ আয়োজন শুরু হয়েছে। এখানে সাধু-ফকিররা অষ্টপ্রহর সাধুসঙ্গে মগ্ন থাকবেন, করবেন আত্মজিজ্ঞাসা এবং গানের মাধ্যমে স্মরণ করবেন লালন সাঁইকে।

গত শুক্রবার থেকেই আখড়াবাড়িতে ভিড় জমাতে শুরু করেন সাধু, ফকির ও ভক্তরা। আজ শনিবার পুরো চত্বরজুড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কারও হাতে ছিল একতারা, কারও হাতে ডুগি। চারদিকে শোনা যাচ্ছিল, “জয় লালন, জয় লালন” ধ্বনি। একতারার টুংটাং শব্দের সাথে কিশোর, তরুণ ও প্রবীণরা মিলে গাইছিলেন লালনের গান। একদিকে সাধক ও ভক্তদের নিজস্ব রীতিতে সাধুসঙ্গ চলছিল, অন্যদিকে সাধারণ দর্শনার্থীদের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠেছিল আখড়াবাড়ির চারপাশ।

আখড়াবাড়িতে সাধু-ফকিররা নিজেদের নির্দিষ্ট রীতি অনুযায়ী গুরুকার্য পালন করছেন। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাখালসেবা, অধিবাস, বাল্যসেবা এবং রোববার দুপুরের পুনঃ সেবার মাধ্যমে এই সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হবে। রাতে একতারা বাজিয়ে চলবে গানের আসর। সাধকদের দৃষ্টিতে এই আয়োজন কেবল গান শোনা বা উৎসব উদযাপনের উপলক্ষ নয়, বরং এটি গুরুর স্মরণ, আত্মজিজ্ঞাসা এবং সাধনার এক বিশেষ সময়। মূল আখড়াবাড়ির ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সাধু-ফকিররা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজেদের গুরুকার্যে ব্যস্ত।

লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহ বলেন, “লালনের আধ্যাত্মিক গান আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের পথ দেখায়। বর্তমান সময়ে হানাহানি ও অসহিষ্ণুতা দূর করতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাঁর মানবতাবাদী দর্শন সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে লালনের দর্শন নিয়ে গবেষণা ও চর্চা বাড়াতে হবে।”

কালীগঙ্গা নদীর পাড়ের মাঠে প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, “লালন ফকিরের জীবনদর্শন সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্কুল-কলেজে ছড়িয়ে দিতে হবে লালনের মরমি চিন্তা।”

বিশেষ অতিথি হিসেবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জায়েদ উর রহমান বলেন, “বর্তমান বিশ্বে লালনের দর্শন জরুরি। পৃথিবীর যেখানে অশান্তি, সেখানে লালনকে প্রয়োজন।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, লালনের দর্শন কাজে লাগিয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।

জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহ ও ফকিরানী আসমা খানম। আসমা খানম বলেন, “মানুষই সব, মানুষকে ভালোবাসতে হবে।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন এবং পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম। মূল আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক রশিদুন নবী। বক্তারা দেশ ও বিদেশে লালনের গান এবং তাঁর দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনা পর্বের পর প্রবীণ সাধু-ফকিররা মূল মঞ্চে উদ্বোধনী গান “তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না” পরিবেশন করেন। এরপর রাতভর গানের আসর চলে। সাধু-ফকিরদের কণ্ঠে শোনা যায় লালনের জনপ্রিয় গান “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে”, “জাত গেল জাত গেল বলে, এ কী আজব কারখানা” এবং “সময় গেলে সাধন হবে না”।

শনিবার সন্ধ্যা ছয়টায় মূল মঞ্চে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। এই আলোচনা সভার পর রাতভর বিভিন্ন শিল্পীর গানের পরিবেশনা চলবে।

কালীগঙ্গা নদীর পাড়ের বিশাল মাঠে বসেছে মেলা। সেখানে অস্থায়ী দোকানে পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা এবং দর্শনার্থীরা কেনাকাটায় ব্যস্ত। সাধুসঙ্গ, গান ও মেলার এই মেলবন্ধনে ছেঁউড়িয়া হয়ে উঠেছে এক বিশাল মিলনমেলায়।

১৮৯০ সালের ১ কার্তিক কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া গ্রামে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। সেই থেকে তাঁর ভক্ত ও অনুসারীরা আখড়াবাড়িতে সমবেত হয়ে স্মরণ করে আসছেন তাঁদের সাঁইজিকে। সময়ের সাথে সাথে এই আয়োজনের পরিসর বেড়েছে এবং এতে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সমাবেশ যুক্ত হয়েছে। তবে সাধু-ফকিরদের কাছে লালনকে স্মরণ করার মূল আকর্ষণ এখনো তাঁর গান, দর্শন ও সাধনার পথ।

ছেঁউড়িয়ার এই আয়োজনের মাধ্যমে লালনের মানবতাবাদী চিন্তা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখার আহ্বান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি শোনা যায় আখড়াবাড়ির সাধুসঙ্গ থেকে শুরু করে মূল মঞ্চের আলোচনা পর্যন্ত।