দিনের প্রচণ্ড গরম এবং রাতের হিমেল হাওয়ার এই বিপরীতমুখী আবহাওয়ার প্রভাবে চুয়াডাঙ্গায় শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হাম, জ্বর, ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে দিশেহারা অভিভাবকেরা ভিড় করছেন স্থানীয় হাসপাতালে। রোগীর এই অস্বাভাবিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা। হাসপাতালের শয্যার তীব্র সংকটে অনেক অসহায় শিশুকে হাসপাতালের মেঝে এবং বারান্দায় শুইয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত এক সপ্তাহে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগে প্রায় ৩ হাজার শিশু চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। মাত্র ৫ শয্যার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। অন্যদিকে, মাত্র ১৩ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১২০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি বহির্বিভাগে প্রতিদিন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ শিশু চিকিৎসার জন্য ভিড় করছে। এসব রোগীর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকা ছাড়াও আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলার শিশুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। রোগীর এই বিপুল চাপ সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ড পরিদর্শনে দেখা যায়, অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন অভিভাবকেরা। পর্যাপ্ত শয্যার অভাবে অনেক মা তাদের সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালের ঠান্ডা মেঝে ও বারান্দায় অবস্থান করছেন।
দামুড়হুদা উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা কুলসুম বেগম তার তিন বছর বয়সি মেয়েকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি অত্যন্ত কষ্টের সাথে বলেন, ‘তিন দিন ধরে বাচ্চার নিউমোনিয়া আর জ্বর নিয়ে মেঝেতে পড়ে আছি। বেড না পাওয়ায় এই ঠান্ডা মেঝেতেই স্যালাইন দিতে হচ্ছে। রাতে আরও বেশি ঠান্ডা লাগে। বাচ্চার কষ্ট দেখে চোখে পানি ধরে রাখা যায় না।’
অন্যদিকে, চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান তার পাঁচ বছর বয়সি ছেলেকে নিয়ে কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা নেওয়ার পরও শিশুদের শারীরিক অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না। শীতকাল পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই রোগের এমন ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দেওয়ায় আসন্ন মৌসুম নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকেরা।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুর রহমান মালিক খোকন জানান, ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাধারণত কমে যায়। এর ফলে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও হামের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিশুদের সুস্থ রাখতে অভিভাবকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “শিশুদের যেন হঠাৎ অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরমের মধ্যে পড়তে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাসি ও খোলা খাবার এড়িয়ে চলা, বিশুদ্ধ পানি পান করানো এবং শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি রোগের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”