ফুসফুসের সংক্রমণ হিসেবে পরিচিত নিউমোনিয়া বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তবে যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্রোগের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের শরীরে নিউমোনিয়া বা ফ্লুর সংক্রমণ হলে তা শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এই বাড়তি চাপের ফলে হৃদ্রোগের জটিলতা আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তাই হৃদ্রোগীদের নিউমোনিয়া ও ফ্লু থেকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্লু বা নিউমোনিয়ার সংক্রমণের ফলে শরীরে এক ধরনের প্রদাহ তৈরি হয়। এই সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট শারীরিক চাপ হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য বাড়তি ঝুঁকি বয়ে আনে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলিওরের মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষ করে যাঁদের হার্ট ফেইলিওর বা হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লক রয়েছে, তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস, কিডনি কিংবা ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসি এবং বিভিন্ন চিকিৎসাবিষয়ক সংগঠন হৃদ্রোগসহ উচ্চঝুঁকির ব্যক্তিদের ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকাদানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই কার্ডিওভাসকুলার রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক হৃৎস্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে টিকাদানের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ফ্লুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তাই ফ্লুর মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া শ্রেয়, যাতে শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। সাধারণত প্রতিবছর এই টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ফ্লু ছাড়াও ব্যাকটেরিয়াজনিত আরও এক ধরনের নিউমোনিয়া হতে পারে, যার জীবাণুর নাম নিউমোকক্কাস।
অনেকের মধ্যে এই ভুল ধারণা রয়েছে যে, হৃদ্রোগের ওষুধ চললে এই টিকা নেওয়া যাবে না। তবে এটি সঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, হৃদ্রোগের ওষুধ রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজন, অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোকক্কাল টিকা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং হৃদ্রোগের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সাহায্য করে।
বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ বা কিডনির রোগের মতো অন্যান্য ক্রনিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে টিকার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।
কারা নিউমোকক্কাল টিকা নেবেন এবং একবার নিলেই যথেষ্ট কি না, তা নির্ধারণের আগে ব্যক্তির বয়স, রোগের ধরন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার অবস্থা এবং আগে কোনো নিউমোকক্কাল টিকা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। চাইলে একই দিনে ফ্লু ও নিউমোকক্কাল টিকা নেওয়া সম্ভব। তবে দুটি টিকা আলাদা সিরিঞ্জে এবং শরীরের আলাদা স্থানে দিতে হয়।
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ, ডায়াবেটিক ফুট এবং বাইপাস রোগীদের টিকাদানের অবস্থা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে, বয়স বেশি অথবা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে, তাঁদের ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোকক্কাল টিকার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। তবে কখন টিকা দেওয়া হবে, তা রোগীর সংক্রমণ, অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার অবস্থা এবং সার্বিক শারীরিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসক এসব বিষয় বিবেচনা করে টিকা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করেন। অনেকের ধারণা, টিকা শুধু শিশুদের জন্য। এই ধারণা ঠিক নয়। বয়স্ক ব্যক্তি, হৃদ্রোগী ও ভাসকুলার ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিউমোকক্কাল টিকা গুরুত্বপূর্ণ।
— লেখক: ইউনিট প্রধান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিভিডি), ঢাকা।