পেশায় চা-দোকানি হওয়া বাবা-মায়ের অভাব ও অনটনের প্রতিকূলতাকে জয় করে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন সারা দেশের ১৩৫ জন শিক্ষার্থী। এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকদের সম্মান জানাতে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘নাম্বার ওয়ান’ একটি বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট, সনদপত্র এবং এককালীন শিক্ষাবৃত্তির অর্থ তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি, তাঁদের বাবা ও মায়েদের গলায় সম্মানসূচক মেডেল পরিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কথা মাথায় রেখে ব্র্যান্ডটি আগামী দুই বছর এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষাসহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এই উদ্যোগের আওতায় শিক্ষার্থীরা অনলাইন এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম ‘টেন মিনিট স্কুলে’-র এইচএসসি প্রস্তুতিমূলক একাডেমিক কোর্স করার বিশেষ সুযোগ পাবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও মুক্তকণ্ঠের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক এবং টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আয়মান সাদিক। এছাড়া মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. রহমতুল্লাহ খোন্দকার, চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার আতিক উজ জামান খান, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (অডিট) সাজ্জাদ হোসেন, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ব্র্যান্ড) মো. মাহবুবুর রহমান, অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার অর্জুন চন্দ্র নাথ, আব্দুর রহিম শেখ এবং রতন মজুমদারসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন তমা রশিদ।
সংবর্ধনাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘জীবনে বড় হওয়ার জন্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বপ্ন দেখা, পরিশ্রম করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস। তোমাদের অনেকের পরিবার হয়তো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা যেন তোমাদের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। নিজেদের যোগ্যতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তোমরা পরিবার ও সমাজের জন্য গর্ব বয়ে আনবে—এটাই প্রত্যাশা।’
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. রহমতুল্লাহ খোন্দকার বলেন, ‘বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বাইরেও নাম্বার ওয়ান ব্র্যান্ড গ্রাহকদের জন্য নানা কাজ করে। তারই অংশ হিসেবে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক গ্রাহকদের অনুপ্রেরণা দিতে এ আয়োজন। চা–দোকানিদের সন্তানদের অর্জনই আমরা উদ্যাপন করতে চেয়েছি, যাতে তাঁরা সৎ, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক হয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারেন।’
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার কথা জানান চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার আতিক উজ জামান খান। তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের দিন। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এ উদ্যাপন শুধু আজকের আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। উচ্চমাধ্যমিকের দুই বছরসহ শিক্ষার পরবর্তী ধাপ পর্যন্ত আমরা তাঁদের সঙ্গে থাকব। কারণ, অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার আগেই ঝরে পড়তে দেখা যায়।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আয়মান সাদিক বলেন, ‘এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে তোমরা নিজেদের মেধার পরিচয় দিয়েছ। এবার এই অর্জনকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হবে। নিয়মিত পড়াশোনা, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে এইচএসসিতে ভালো করতে পারবে। তোমাদের শিক্ষাযাত্রায় নাম্বার ওয়ানের এই সহায়তা যেন কাজে লাগে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফারহান সাদিক (লিলিপুট ফারহান) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে, আমি যদি আমার মা-বাবাকে এভাবে সম্মানিত করার সুযোগ পেতাম, ভালো লাগত।’
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলা থেকে বাবাকে সাথে নিয়ে অনুষ্ঠানে আসা নুসরাত জাহান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। বাবাকে ধন্যবাদ, তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আমি নির্ভার থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছি। এমন সুন্দর আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের সাফল্য উদ্যাপনের জন্য নাম্বার ওয়ানকে ধন্যবাদ।’
সন্তানের সাফল্যে আনন্দিত বাবা জহির উদ্দিন প্রধান, যিনি সংবর্ধনাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেনের পিতা, বলেন, ‘আজ আমি খুব খুশি। আমার ছেলের রেজাল্ট শোনার পর যতটা আনন্দ পেয়েছিলাম, আজকের অনুষ্ঠানে এসে ততটাই আনন্দ লাগছে।’
কক্সবাজারের বায়তুশ শরফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া চৌধুরী বলেন, ‘নাম্বার ওয়ানের এই আয়োজন আমাদের জন্য অনেক উৎসাহের। এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দুই বছরের শিক্ষাসহায়তা পাওয়ার সুযোগ আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। আমি ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পরিবার ও দেশের জন্য কিছু করতে চাই।’
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্র্যান্ড ‘নাম্বার ওয়ান’ দীর্ঘকাল ধরে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে আসছে এবং প্রান্তিক চা-দোকানিদের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান সংবর্ধনা ২০২৬’ শীর্ষক এই আয়োজন করা হয়। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগটি এবার তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হলো। গত দুই বছরে মোট ১৫০ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে, যারা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন।