ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন নাজমা আক্তারের ছেলে। কিন্তু মাত্র নয় মাস আগে তার অস্বাভাবিক মৃত্যু পরিবারটিকে এক গভীর শোকের মুখে ঠেলে দেয়। সেই অপূরণীয় ক্ষতি আর শোক বুকে চেপে ধরে জীবন কাটাচ্ছেন নাজমা আক্তার। তবে এই শোকের মাঝেও আলোর রেখা দেখিয়েছেন তার ছোট মেয়ে মানসী হক বাঁধন। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে মানসী বয়ে এনেছে বড় সাফল্য। মেয়ের এই কৃতিত্ব উদ্‌যাপনের জন্য আজ শুক্রবার তাকে নিয়ে অংশ নিয়েছেন নাজমা আক্তার, শিখো–মুক্তকণ্ঠ জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানে আবেগপ্লুত হয়ে নাজমা আক্তার বলেন, ‘৯ মাস হলো আমার ছেলে ঢাকায় মারা গেছে। আজ এখানে এসেছি ছোট মেয়ে বাঁধনকে নিয়ে। সে মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছেলে হারানোর শোক বুকে চেপে মেয়ের সাফল্য উদ্‌যাপনে এসেছি।’

মুক্তকণ্ঠের বিশেষ আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এই জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ এই মূল স্লোগানকে সামনে রেখে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত মেধাবীদের জন্য এই সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে।

এই মহতী আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় পাশে থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা।

সংবর্ধনার মেহেরপুর পর্বটি জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অত্যন্ত জমকালোভাবে আয়োজন করা হয়। সকাল নয়টা থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থীরা একে একে অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হতে শুরু করে। কেউ এসেছে বাবা-মায়ের সাথে, আবার কেউ এসেছে সহপাঠীদের সাথে। দীর্ঘ বিরতির পর বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। দল বেঁধে ছবি তোলা এবং সেলফি তোলার মাধ্যমে তারা তাদের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছিল।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। জেলা বন্ধুসভার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মুক্তকণ্ঠের মেহেরপুর প্রতিনিধি আবু সাঈদ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ আবদুল্লাহ আল আমিন, সাবেক অধ্যাপক নুরুল আহমেদ এবং মুক্তকণ্ঠের রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। তাঁরা শিক্ষার্থীদের এই অসাধারণ সাফল্যের প্রশংসা করার পাশাপাশি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৎ, দায়িত্বশীল এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার জন্য জোরালো আহ্বান জানান।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, প্রকৃত শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অন্যান্য সৃজনশীল বই পড়া এবং মানবিক গুণাবলি বিকাশে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন তাঁরা।

কৃতী শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে মঞ্চে বক্তব্য দেন মেহেরপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের জান্নাতুল নাইমা ডোনা এবং রামিছা তাবাসসুম। এছাড়া জিনিয়াস ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আফরিনের সাথে আসা অভিভাবক আমজাদ হোসেন তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেন।

আলোচনা পর্বের সমাপ্তিতে অতিথিরা উপস্থিত সকল কৃতী শিক্ষার্থীকে মাদক, মিথ্যা এবং মুখস্থবিদ্যার বিরুদ্ধে ‘না’ বলার শপথ পাঠ করান।

পুরো অনুষ্ঠান চলাকালীন মেহেরপুর বন্ধুসভা এবং স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা প্রদর্শিত হয়। পাশাপাশি কুইজ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।