তিন বছর আগে বড় মেয়ে উমামী আকরাম খানের সঙ্গে মুক্তকণ্ঠের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন শাহানা পারভীন। এবার ছোট মেয়ে ইমামী আকরাম খান এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ায় আবারও সেই আয়োজনে যোগ দিলেন তিনি। দুই মেয়ের সাফল্যের স্বীকৃতি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তবে এই আনন্দের পাশাপাশি তাঁর মনে রয়ে গেছে এক ধরণের আক্ষেপ। তিনি বলেন, “মেয়েদের সঙ্গে দুটি অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে আনন্দ পেয়েছি। তবে মনের কোণে কিছুটা কষ্ট আছে। আফসোস, ভালো রেজাল্ট করলেও আমাদের সময় কেউ এমন আয়োজন করেনি।”
বুধবার চুয়াডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত শিখো-মুক্তকণ্ঠ জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে শাহানা পারভীন তাঁর এই আবেগঘন অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে পাশে থাকা আরেক অভিভাবক মুন্নি রহমান বলেন, “মুক্তকণ্ঠের আয়োজন দেখে মনে হয়, নিজে আবার পরীক্ষার হলে বসে পড়ি।” পুরো আয়োজনটি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “এখানে গুণী-মানি অনেকেই কথা বললেন। অনেকের সঙ্গে পরিচিত হলাম। এককথায় অনেক অনেক ভালো লেগেছে।”
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে দেশের ৬৪টি জেলাতেই মুক্তকণ্ঠের উদ্যোগে এবং ডিজিটাল শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হচ্ছে। এই কর্মসূচিরই অংশ হিসেবে আজ চুয়াডাঙ্গা শহরের সাহিদ গার্ডেনে বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
পুরো আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। এছাড়া এই আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা।
সকাল নয়টা থেকেই সাহিদ গার্ডেন অনুষ্ঠানস্থলে ভিড় জমাতে শুরু করে কৃতী শিক্ষার্থীরা। কেউ এসেছে বাবা-মায়ের হাত ধরে, আবার কেউ এসেছে বন্ধুদের সাথে। দীর্ঘ বিরতির পর বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা। দল বেঁধে ছবি তোলা এবং সেলফি তোলার মাধ্যমে তারা তাদের আনন্দ ভাগ করে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।
সকাল ১০টায় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। চুয়াডাঙ্গা বন্ধুসভার পরিবেশ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সালেকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মুক্তকণ্ঠের চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি শাহ আলম। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান, আর্থমুভিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মুজিবুল হক, মুক্তকণ্ঠের রাজশাহী অফিসের নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ এবং চুয়াডাঙ্গা বন্ধুসভার সভাপতি দেলোয়ার হোসেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “জিপিএ-৫ বড় কথা নয়; কতুটুক শিখলাম, কতটুকু জানলাম সেটাই বড়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হলে জানতে হবে। এ জন্য প্রচুর পড়াশোনার পাশাপাশি হাতে–কলমে শিখতে হবে।”
অন্যদিকে, মুক্তকণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, “আমাদের তিনটি মা আছে। জননী, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা। বাংলাদেশ ছেড়ে পৃথিবীর যেখানেই যাব, একটাই অনুরোধ—এই তিন মাকে যেন ভুলে না যাই।” তাঁর বক্তব্যের পর তিনি উপস্থিত অতিথিদের সাথে নিয়ে কৃতী শিক্ষার্থীদের শপথ বাক্য পাঠ করান। এই শপথের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মাদক, মিথ্যা এবং মুখস্থনির্ভর পড়াশোনাকে ‘না’ বলার অঙ্গীকার করে।
প্রকৌশলী মুজিবুল হক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তব্যে বলেন, “তোমরাই আজকের প্রধান অতিথি। ভবিষ্যতে প্রতিটি ধাপেই এর ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। জেনে-বুঝে পড়াশোনার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে কথা বলার ধরন রপ্ত করতে হবে। নিজেকে বিকশিত করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. শাজাহান আলী বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গা সরকারি ভিক্টোরিয়া জুবিলি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জেসমিন আরা খাতুন এবং সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রেজাউল করিম। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন আলমডাঙ্গা থেকে আসা শিক্ষার্থী পুষ্প নাজনিন তৃপ্তি।
পুরো অনুষ্ঠান চলাকালীন বন্ধুসভা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া একটি কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যেখানে বিজয়ী ১০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন।