সকাল ১০টায় নির্ধারিত ছিল অনুষ্ঠানটি, তবে এই আনন্দ উৎসবে শামিল হতে মাইনুল ইসলাম ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি শুরু করেন ভোর ৬টায়। সোনারগাঁ থেকে তিনি ছুটে আসেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। জিআর ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মাইনুল এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। যথাসময়ে শিখো-মুক্তকণ্ঠ কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন তিনি।
মাইনুলের মতো অসংখ্য শিক্ষার্থীর পদচারণায় আজ শনিবার সকাল থেকেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো অনুষ্ঠানস্থল। কেউ এসেছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে, কেউবা এসেছেন প্রিয় বন্ধুদের দল নিয়ে। কারো কাছে এই আয়োজনটি ছিল ভালো ফলের স্বীকৃতি, আবার কারো কাছে এটি ছিল পুরোনো বন্ধুদের সাথে পুনরায় দেখা করার এক দারুণ সুযোগ।
গান, নাচ, আড্ডা আর সেলফির মাধ্যমে নিজেদের অর্জনের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার একটি বড় উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই সংবর্ধনা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর।
তবে এই আনন্দোৎসবে অংশ নেওয়ার পেছনে অনেকেরই রয়েছে কঠিন লড়াইয়ের গল্প। যেমনটি ঘটেছে সাজিদ সরকারের ক্ষেত্রে। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী সাজিদের জন্য জিপিএ-৫ পাওয়ার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। পারিবারিক ও মানসিক কিছু সমস্যার কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছিলেন না তিনি। এক পর্যায়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন সাজিদ। এসএসসির প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় চার বিষয়ে ফেল করেন তিনি। পরবর্তীতে টেস্ট পরীক্ষায় এক বিষয়ে অকৃতকার্য হন।
এই ফলাফল সাজিদকে হতাশ করলেও তিনি সেই হতাশার কাছে হার মানেননি। বোর্ড পরীক্ষার আগের দুই মাস তিনি পড়াশোনায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছেন সাজিদ। বন্ধুদের সাথে আড্ডা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া—সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই কঠোর পরিশ্রমের ফল পান সাজিদ। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
শিখো-মুক্তকণ্ঠ জিপিএ-৫ কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন সাজিদ। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকার বাসিন্দা এই শিক্ষার্থী বলেন, “চেষ্টা থাকলে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়।”
নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া ফাদিয়া চৌধুরী ফিমার কাছেও এই অর্জন অত্যন্ত আনন্দের। তবে তার এই আনন্দের সাথে জড়িয়ে আছে গভীর কৃতজ্ঞতা। মা-বাবা ও শিক্ষকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে সে বলে, “তাদের সহযোগিতা ও চেষ্টার কারণেই ভালো ফল করা সম্ভব হয়েছে।”
রূপগঞ্জের আবদুল হক হাই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া সাজিদা আক্তার এসেছেন চার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে। দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সাথে পুনরায় দেখা, আড্ডা আর গান—সব মিলিয়ে দিনটি তার কাছে হয়ে উঠেছে অত্যন্ত আনন্দময়। অন্যদিকে বন্দর গার্লস স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া মায়িশা শাফিয়া নাসরিনের কাছে সংবর্ধনার আনন্দ ছিল ভিন্ন স্বাদের। কষ্ট করে অর্জন করা ফলের স্বীকৃতি পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।
শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয়, তাদের অভিভাবকদের জন্যও দিনটি ছিল খুশির। সন্তানদের সাফল্য উদ্যাপন করতে এসে অভিভাবকেরাও ভাগ করে নিয়েছেন নিজেদের অনুভূতি। কেউ সন্তানের ভালো ফলের জন্য গর্বিত, কেউ আবার এই আয়োজনকে দেখছেন ভবিষ্যতে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা হিসেবে।
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী আলীজানের অভিভাবক আমেনা বেগম বলেন, “তাঁদের সময়ে এই সংবর্ধনার আয়োজন ছিল না। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের দেখতে এলাকার মানুষ যেতেন। এখন এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করতে উৎসাহিত করছে।”
সৌমিক সরকারের মা কাজলী সরকার বলেন, “সন্তান ভালো ফল করছে, তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে—এতে তাঁদেরও খুব ভালো লাগছে। সন্তানদের সঙ্গে তারাও আনন্দ ভাগাভাগি করছেন।” আরেক শিক্ষার্থী ইভানের মা সোহেলী আক্তার বলেন, “এমন আয়োজন ভবিষ্যতে আরও ভালো করার প্রেরণা জোগাবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।”
মুক্তকণ্ঠের আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় এই জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এই সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মুক্তকণ্ঠের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি মজিবুল হক। তিনি মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমানের চিঠি পড়ে শোনান।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য দিদার-উল আলম বলেন, “জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সাফল্য আসতে পারে, আবার না–ও আসতে পারে; কিন্তু পড়াশোনার পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না।” তিনি আরও বলেন, “এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া জীবনের চূড়ান্ত অর্জন নয়। তোমাদের সামনে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কৈশোরের আনন্দ করার প্রবণতা স্বাভাবিক হলেও ভবিষ্যৎ গড়তে সময়ের সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ জরুরি।”
নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, “শিক্ষার্থীরা তোমরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে প্রবেশ করেছ। এখন নিজেদের সময় কীভাবে কাজে লাগাবে, তা ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
মুক্তকণ্ঠের উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি বলেন, “এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। সে বিবেচনায় তোমাদের এই অর্জন নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তোমরা খুব ভালো করেছ, তোমরা মেধাবী মুখ। তোমাদের এই ভালো ফলের জন্য শিক্ষক ও মা-বাবার অবদান বেশি। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে এবং তাঁদের কথা শুনতে হবে।”
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যা, মিথ্যা ও মাদককে ‘না’ বলতে শপথ পাঠ করান নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারুক আহমদ। আরও বক্তব্য দেন শিখোর মেন্টর রায়হান এ আর খান।
এরপর কুইজ বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপনী টানেন নারায়ণগঞ্জ বন্ধুসভার সভাপতি সাব্বির আল ফাহাদ।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল গান, নাচ ও মূকাভিনয়ের মতো আয়োজন। অর্চনা একাডেমির শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। ‘মাইম ফেইস’ পরিবেশন করে মূকাভিনয়। গান পরিবেশন করেন কৃতী শিক্ষার্থী মুমতাহীনা রহমান। সবশেষে গান পরিবেশন করেন শিল্পী অনিক সূত্রধর।