ছাত্রদলের এক নেতাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে গুরুদাসপুর আমলী আদালতের বিচারক মেহেদী হাসান এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতের পুলিশ পরিদর্শক আসমাউল হক মুক্তকণ্ঠকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার গভীর রাতে নূরুজ্জামানকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। প্রথমে তাঁকে গুরুদাসপুর থানায় নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে নাটোর জেলা সদরে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে আনা হয়। আজ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ডিবি পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
বিকেল পাঁচটার দিকে নূরুজ্জামানকে ডিবি কার্যালয় থেকে গুরুদাসপুর আমলী আদালতে হাজির করা হয়। গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমির হোসেন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, “আসামি ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের (এমপি) ছেলে। তিনি এলাকার খুবই প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ইন্ধনে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে কি না এবং হত্যাকাণ্ডে কারা কারা জড়িত ছিল, ঘটনার সময় ব্যবহৃত অস্ত্র কোথায় আছে, তা জানার জন্য ১০ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।”
আসামি পক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত না থাকায় আদালত নূরুজ্জামানকে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন। তখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নূরুজ্জামান বলেন, “আমি শাকিল হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানি না। এই ঘটনায় আমার জড়িত থাকার কোনো প্রমাণও নেই। শুধু দুটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সেই সূত্র ধরে পুলিশ আমাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করেছে।”
শুনানি শেষে আদালত আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ পরিদর্শক আসমাউল হক জানান, আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আসামি পুলিশ হেফাজতে থাকবেন।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় চাঁচকৈড় বাজার থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখান থেকে তাঁকে রাজশাহী এবং পরবর্তীতে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ১২ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করার পর গতকাল সোমবার রাত সোয়া আটটার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শাকিল।
এর আগে শাকিলের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁর বাবা রবিউল করিম ১৯ অক্টোবর অজ্ঞাতপরিচয় ৮-১০ জনকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় মামলা করেছিলেন। গতকাল সোমবার রাতে শাকিল মারা যাওয়ার পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমির হোসেন মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার জন্য আজ আদালতে আবেদন করেন।
ছাত্রদলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নাটোর-৪ আসনের এমপি আবদুল আজিজের দুই ছেলের পৃথক অনুসারী ও সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে এবং দুই ভাইয়ের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বও বিদ্যমান। নিহত শাকিল এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামানের অনুসারী ছিলেন। অন্যদিকে, নূরুজ্জামান গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং তাঁর ছোট ভাই মাহমুদুজ্জামান গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক।
এদিকে, সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ আজ মঙ্গলবার সকালে গুরুদাসপুর উপজেলা সদরের কাছারিপাড়ায় নিহত ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলামের বাড়িতে যান। সেখানে তিনি শাকিলের বাবা রবিউল করিম ও পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা জানান এবং এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।