ছাত্রদলের এক নেতার মৃত্যুর ঘটনায় নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গতকাল সোমবার গভীর রাত থেকে তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় দুর্বৃত্তদের এক নৃশংস হামলায়, যেখানে গুরুতর আহত হয়ে ১২ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করার পর গতকাল রাত সোয়া আটটার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাটোরের গুরুদাসপুর পৌরসভা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম। এই মৃত্যুর পর হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশ তৎপরতা শুরু করে।

ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের দুই ছেলের পৃথক অনুসারী ও সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে এবং এই দুই ভাইয়ের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। নিহত ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামানের অনুসারী ছিলেন বলে জানা গেছে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শাকিলের মৃত্যুর পর গতকাল রাতে নূরুজ্জামানকে নাটোর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ হেফাজতে নেয়। প্রথমে তাঁকে গুরুদাসপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে নাটোর জেলা সদরে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে তাঁকে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়েছে।

সংসদ সদস্যের বড় ছেলেকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নান।

এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মুক্তকণ্ঠ নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন। আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন। তাই এ ব্যাপারে আপাতত কিছু জানানো যাচ্ছে না।”

আজ বেলা ১টায় প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত নূরুজ্জামান নাটোর ডিবি কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, তাঁর ছোট ভাই মাহমুদুজ্জামান গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় চাঁচকৈড় বাজার থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম। স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে রাজশাহীতে এবং পরে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ ১২ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে গতকাল রাত সোয়া আটটার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই হামলার পর ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল করিম অজ্ঞাতপরিচয় ৮-১০ জনকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, গত ২০ এপ্রিল শাকিল ইসলাম নিজের ফেসবুক আইডি থেকে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। সেই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয় আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে। যারা আমাকে মারতে পারবে, তাদের নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডাইরি (সাধারণ ডায়েরি) করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে এই ডাইরি (জিডি) অনুযায়ী মামলা করে দেবেন।”

ফেসবুক পোস্টের এই বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম বিস্তারিত কিছু না বললেও জানান, সবকিছু বিবেচনা করেই তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

এদিকে আজ সকালে গুরুদাসপুর উপজেলা সদরের কাছারিপাড়ায় শাকিল ইসলামের বাড়িতে যান সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। সেখানে তিনি নিহত ব্যক্তির বাবা রবিউল করিম ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। এই শোকের মুহূর্তে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।