পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, আইজিপির এই বক্তব্য বর্তমান সরকারকে বিব্রত করেছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিএনপির সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পুলিশপ্রধানের মুখে ‘ক্রসফায়ার’-এর কথা আসা অত্যন্ত ভাববার বিষয়।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী জোর দিয়ে বলেন, দেশে প্রচলিত আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ দমনের জন্য কোনো ধরনের আইনবহির্ভূত পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন নেই। অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে প্রচলিত আইনের প্রয়োগ ঘটিয়েই ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, বেআইনি পথ অনুসরণ করে কখনোই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে রিজভী বলেন, “কীভাবে তিনি ক্রসফায়ারের কথা বলেন?” তবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আইজিপির এই বক্তব্য যদি অনিচ্ছাকৃত হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আরও বলেন, গত ১৭ বছর ধরে গুম, খুন এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। তাই বর্তমানে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, আইনবহির্ভূত কোনো পদ্ধতির পরিবর্তে আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই পুলিশ বাহিনীকে অপরাধ দমনে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। এমন এক সময়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের পক্ষ থেকে ক্রসফায়ার ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কথা বলা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

যুবসমাজের ভূমিকা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, দেশের যুবকদের সুসংগঠিত হয়ে জাতীয় উন্নয়নে কাজ করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুবকরা যেন কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজির মতো কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে। একই সঙ্গে যুবসমাজ যেন সাধারণ মানুষের ভীতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা নিয়ে কথা বলে তিনি বলেন, পুলিশে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। কোনো প্রকার প্রভাব ছাড়াই যদি আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি পুনরায় মনে করিয়ে দেন যে, গুম হোক বা ক্রসফায়ার—কোনোটিই অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না।

উল্লেখ্য, এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে এক বক্তব্যে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেছিলেন, “সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না পুলিশ।” তার এই মন্তব্যের পর তাৎক্ষণিকভাবেই জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে।

আইজিপির এই বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে ওই দিন সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার অর্থে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে কঠোর অবস্থান বোঝাতেই তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন।