আমাদের বর্তমান সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী নয় এবং পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করার প্রবণতা ত্যাগ করতে পারছে না—তা প্রতি দুই দিন অন্তর আমরা উপলব্ধি করি। রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা তাঁদের আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, এই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাঁরা কোনোভাবেই নাগরিকমুখী করতে আগ্রহী নন। পুলিশের মহাপরিচালকের (আইজিপি) সাম্প্রতিক বক্তব্যে একজন নাগরিক হিসেবে ভীত হওয়ার এবং অতীতের সহিংসতার স্মৃতিগুলো পুনরায় জেগে ওঠার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর চকবাজারে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন, এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন।’

সমাজ ও রাষ্ট্রে পুলিশের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সেই বিতর্ক এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, যখন আমরা আলোচনা করি যে পুলিশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারবে না, তখন সেই আলাপকে পুলিশের ‘প্রয়োজনীয়তা’র স্তরে নিয়ে আসার মূল উদ্দেশ্যই হয় আমাদের প্রকৃত উদ্বেগকে এড়িয়ে যাওয়া। নাগরিক সমাজ দীর্ঘকাল ধরে যে আলোচনা করে আসছে, তা ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন’ আছে কি নেই, তা নিয়ে নয়; বরং এই প্রয়োজনীয়তাকে পুলিশ বাহিনী কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে। মূল প্রশ্নটি হলো—তারা কি নাগরিকদের জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করবে, নাকি সাধারণ মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে?

সমাজ ও রাষ্ট্রে পুলিশের প্রয়োজন আছে কি না, এই আলোচনা এখানে নিরর্থক। কারণ, আমরা যখন আলোচনা করি—পুলিশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারবে না, তখন সেই আলাপকে সমাজ ও রাষ্ট্রে পুলিশের ‘প্রয়োজনীয়তা’র স্তরে নিয়ে আসার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আমাদের মূল উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া।

এবার আসা যাক আমাদের প্রধান আশঙ্কার বিষয়ে—ক্রসফায়ার। ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কতটা আইনি, কতটা বেআইনি কিংবা কতটা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, তা ২০০৪ সালের পর থেকে কখনোই তর্কের বিষয় ছিল না। শুরু থেকেই বিশ্বের প্রায় সব মানবাধিকার সংগঠন এগুলোর তীব্র বিরোধিতা করে অজস্র নিন্দা জানিয়েছে। এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‍্যাবের (বর্তমানে র‍্যাব বিলুপ্ত হয়ে এসআরবি হয়েছে) সম্পৃক্ততার কারণে আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনেকবার র‍্যাব নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ ধরনের ঘটনার যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তাতে রাষ্ট্র বিনা বিচারে কাউকে প্রাণদণ্ড দিতে পারে না—এই বিষয়েই একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। প্রাণের অধিকারই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি।

পুলিশের আইজি বলেছেন, সরকার অনুমতি দিলে তাঁরা ক্রসফায়ার করতে পারবেন—প্রথমত, এই উক্তিটিই দেশের নাগরিকদের জন্য চরম অপমানজনক। জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত এবং জনগণের সেবা দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্বরত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন বিচারবহির্ভূতভাবে নাগরিককে মেরে ফেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তা কতটা ‘অসাংবিধানিক’, অপমানজনক ও ভীতিকর, তা পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, সরকার চাইলেই কি তিনি নাগরিকের প্রাণহানি ঘটাতে পারেন? যদি কোনো আইন বা সংবিধান এভাবে নাগরিককে মেরে ফেলার অনুমতি দিয়ে থাকে, তবে নাগরিকেরা তা কেন মেনে নেবেন?

এখান থেকেই জন্ম নেয় দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কেউ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা এমন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন, তাহলে এর তদন্ত কে করবে? আইজিপি দাবি করেছেন, তাঁদেরও ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ আছে।

সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ তা সত্ত্বেও সংবিধান ও দণ্ডবিধির ভাষায় এমন কিছু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে, যার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী চাইলেই যেকোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘বৈধ’ হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। এই কারণেই সব আমলের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সরকারি প্রেসনোটের ভাষা ও যুক্তির কাঠামো সর্বদা একই রকম থাকে।

এখান থেকেই আসে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কেউ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা এমন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন, তাহলে এর তদন্ত কে করবে? আইজিপি বলেছেন, তাঁদেরও ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ আছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের সদস্যরা কেউ অপরাধ করলে আমরা যদি ব্যবস্থা না নিই, তখন আপনি বলতে পারেন যে আপনারা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি।’

আইজিপি বোঝাতে চেয়েছেন, পুলিশের সদস্যরা অপরাধ করলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এই কথাটি ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। ক্রসফায়ারের সঙ্গে র‍্যাবের নাম সব সময় উচ্চারিত হলেও পুলিশ বাহিনীও এতে গভীরভাবে জড়িত।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডিবিসহ পুলিশ বাহিনীর (৪৮.০৫ শতাংশ) সম্পৃক্ততা র‍্যাব বাহিনীর (৩১.৯ শতাংশ) চেয়ে বেশি ছিল।

ক্রসফায়ারের ঘটনা যে কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির ‘অপরাধ’ নয়, বরং এটি একটি পদ্ধতিগত বিষয়, তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। যেমন টেকনাফ থানার বহুল আলোচিত সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বন্দুকযুদ্ধের জন্য ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে যে ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন, তার সব কটি ঘটনাতেই আসামি নিহত হয়েছিলেন (মুক্তকণ্ঠ, ৬ আগস্ট ২০২০)। অর্থাৎ, বাহিনী হিসেবে তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে না। আইজিপির কথা থেকেও স্পষ্ট যে, তাঁরা যেটিকে ‘অপরাধ’ বলে সাব্যস্ত করতে চান, সেখানে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত নেই।

যদি কোনো বাহিনীপ্রধানের অবস্থান এমন হয়, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তদন্ত কে করবে—এই প্রশ্নের গুরুত্ব পুনরায় সামনে চলে আসে। যে ‘ঘটনা’কে বাহিনীর প্রধান ‘অপরাধ’ই মনে করেন না, বরং সরকার চাইলে তা করার বাসনা প্রকাশ করেন, সেই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত তাঁরা কোনোভাবেই করতে পারবেন না, তা আবারও প্রমাণিত হলো।

পুলিশপ্রধানের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ সদর দপ্তর গতকালই একটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। সেখানে পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাতে যেমন ক্রসফায়ার-পরবর্তী সরকারি প্রেসনোটের চিরাচরিত ভাষা ও যুক্তি রয়েছে, তেমনি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকিও মিশে আছে। পুলিশ যে আত্মরক্ষার জন্য ‘আইন’ অনুযায়ী এমন কাজ করতে পারে, সেটিই যেন পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

টেকনাফ থানার বহুল আলোচিত সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বন্দুকযুদ্ধের জন্য ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে যে ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন, তার সব কটি ঘটনাতেই আসামি নিহত হয়েছিলেন (মুক্তকণ্ঠ, ৬ আগস্ট ২০২০)।

একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধানের মুখ থেকে আসা এমন বক্তব্য নাগরিকের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করে। বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশে আন্দোলন সহিংস রূপ নিলেও পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির নজির সচরাচর দেখা যায় না। অথচ আমাদের পুলিশপ্রধান নিজেই প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করছেন! এই উক্তি প্রমাণ করে, বাহিনীর মনস্তত্ত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোয় এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা গভীরভাবে গেঁথে আছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীকে আমূল সংস্কার করে একে নাগরিকবান্ধব ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের যে সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল, আমরা কি অবহেলায় তা হাতছাড়া করে ফেললাম?

অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নাগরিকের জীবন এবং স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করাই যেখানে মূল অগ্রাধিকার হওয়ার কথা ছিল, সেখানে একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সর্বোচ্চ পদ থেকেই আজ প্রকাশ্যে নাগরিকদের প্রাণসংহারের প্রচ্ছন্ন হুমকি শুনতে হচ্ছে।

—সহুল আহমদ: লেখক ও গবেষক