পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বক্তব্য সরকারের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর বলে দাবি করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি জানান, যে বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছে, সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন পুলিশপ্রধানের মুখে এমন কথা শোনা তাঁদের জন্য চিন্তার বিষয়।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা (মেডিকেল ক্যাম্প) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
পুলিশ বাহিনীর প্রধান যে সরকারেরই একটি অংশ, তা উল্লেখ করে রিজভী প্রশ্ন তোলেন, ‘তিনি কীভাবে ক্রসফায়ারের কথা বলেন?’ তবে আইজিপির এই বক্তব্য যদি অনিচ্ছাকৃত হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
রুহুল কবির রিজভী মনে করিয়ে দেন যে, গত ১৭ বছর ধরে বিএনপি ক্রসফায়ার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রক্তক্ষরণ এবং ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করেছে। তিনি বলেন, সেই সংগ্রামেরই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আমরা জুলাই এবং ৫ আগস্ট পেয়েছি। এরপর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সারা দেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়া। এমন এক সময়ে পুলিশ বাহিনীর প্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের মতো কথা তাঁদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।
দেশ থেকে অপরাধ দমনে পর্যাপ্ত আইনের কথা উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, এসব আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই সন্ত্রাস ও অপরাধ দমন করা সম্ভব। পাশাপাশি তিনি কিশোর অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রিজভী আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন এবং তাঁদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। কোনো প্রকার বাহ্যিক প্রভাব ছাড়াই যদি আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, গুম হোক বা ক্রসফায়ার—কোনোটিই অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কথা বলা ও কাজ করা উচিত। সস্তা কৃতিত্ব অর্জনের জন্য কোনো বক্তব্য দেওয়া হলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে এক বক্তব্যে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেছিলেন, “সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করা হবে।” তাঁর এই মন্তব্যের পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নানা মানবাধিকার সংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ প্রকাশ করে।
আইজিপির এই বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার অর্থে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতেই তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন।