একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সম্পন্ন করার জন্য রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানসহ (আইইডিসিআর) মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠানের গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই ধরনের গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা দীর্ঘদিনের ছিল এবং এর জোরালো দাবিও ছিল। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলগুলো সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা।

বর্তমানে বাংলাদেশ হাম রোগের মোকাবিলায় এক কঠিন ও জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটময় সময়ে গবেষণার ফলাফলগুলো নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা এবং গঠনমূলক বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, টিকাদান বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতিতে এই ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলে দেশের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারব।

গবেষণার তথ্যানুসারে দেখা যাচ্ছে, ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। সংখ্যার বিচারে এই হারটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং বড়। দেখা যাচ্ছে যে, অনেক শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে, তা সত্ত্বেও তারা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো।

এই ক্ষেত্রে টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। টিকা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি থাকলে টিকার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একইভাবে, টিকা পরিবহনের সময়কার অব্যবস্থাপনার কারণেও মান খারাপ হতে পারে। এছাড়া যারা টিকা প্রদান করছেন, তাঁদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণেও শিশু সঠিক মানের টিকা না-ও পেতে পারে। অ্যাম্পুল থেকে সঠিক পরিমাণে টিকা নেওয়া হচ্ছে কি না এবং শিশুকে যথাযথ পরিমাণে টিকা ইনজেক্ট করা হচ্ছে কি না—এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে শিশুর শরীরে প্রবেশ করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ধাপগুলো যদি যথাযথভাবে অনুসরণ করা যায়, তবে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ খুব কম থাকে।

এর পাশাপাশি শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা নিয়মিত ভিটামিন-এ পাচ্ছে কি না এবং তারা পেটের পীড়ায় ভুগছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। উল্লেখ্য, যেসব শিশু মায়ের বুকের দুধ পান করে, তাদের সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বর্তমানে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির সময় কিছু শিশু বাদ পড়ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার পরেও কিছু শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি গড়ে উঠছে না। এই ধরনের শিশুদের নিয়মিত ক্যাম্পেইনের আওতায় এনে পুনরায় টিকা দিতে হবে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে টিকার বয়সসীমা বাড়িয়ে ১৫ বছর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নে এই গবেষণাটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই গবেষণার ফলাফলের মাধ্যমে আমরা অন্য দেশের সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করতে পারব। এছাড়া আমাদের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো, বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গ্যাভি জানতে পারবে যে বাংলাদেশের শিশুদের জন্য এই টিকা কতটা সুরক্ষা প্রদান করছে। সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে তা পূরণে তাদের বাড়তি কী করণীয় আছে, সেটিও তারা এই গবেষণার মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে পারবে।