একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে যে, হামের টিকা দেওয়ার পরেও ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে না, তাই টিকাদানব্যবস্থা ও টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে।

দেশজুড়ে পরিচালিত হাম-রুবেলার জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইনের পর পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ পরিস্থিতি যাচাই করতে প্রথমবারের মতো এই গবেষণা চালানো হয়। আইইডিসিআরের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক এবং ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের মোট ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা এই কাজে অংশ নেন। আইইডিসিআর এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে মুক্তকণ্ঠ এই গবেষণার সারসংক্ষেপ সংগ্রহ করেছে।

চলতি বছরের মার্চ মাসে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে স্বাস্থ্য বিভাগ ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করে। এই কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ২০ মে শেষ হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন যে, ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন; ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও হামের সংক্রমণ থামেনি।

এই পরিস্থিতিতে শিশুদের শরীরে টিকা কতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করছে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে টিকার কার্যকারিতার কোনো ঘাটতি আছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘদিন ধরে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিলেন। তারা মনে করছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না এবং সামগ্রিক টিকাদান প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

আইইডিসিআরের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয় সেপ্টেম্বর মাসে, জাতীয় হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার ছয়টি গ্রাম ও উপশহর এলাকা থেকে ৯ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩০৯টি শিশুকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষকেরা টিকা কার্ড যাচাই এবং অভিভাবকদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হন যে শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না। এরপর আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে তাদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফলে দেখা গেছে, মোট ৩০৯টি শিশুর মধ্যে ২০৩টির বা ৬৫.৭ শতাংশের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এছাড়া ২১টি বা ৬.৮ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি 'বর্ডার লাইন' বা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে। স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, “এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না।”

গবেষণার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫টির শরীরে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তবে দেখা গেছে, ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সীদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার প্রবণতা বেশি।

গবেষকদের মতে, এক ডোজের চেয়ে দুই বা তিন ডোজ টিকায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি গড়ে ওঠে। কিন্তু হামের বিস্তার রোধ করার জন্য যে পরিমাণ অ্যান্টিবডি প্রয়োজন, শিশুদের শরীরে তার চেয়ে অনেক কম দেখা যাচ্ছে। টিকাবিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়সের সাথে সম্পর্কিত। সাধারণত ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০ জনের মধ্যে ৫০ জনের, ৯ মাস বয়সে দিলে ৮৫ জনের এবং ১২ মাস বয়সে টিকা দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। কিন্তু আইইডিসিআরের এই গবেষণায় সেই হার অনেক কম পাওয়া গেছে।

টিকা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ব্যবহৃত সব টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত। তবে দেশে এই টিকার মান আলাদাভাবে যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা নেই, তাই ধরে নেওয়া হয় যে টিকার মানে কোনো ঘাটতি নেই।

টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “টিকার কার্যকারিতা নষ্ট বা হ্রাস পেতে পারে একাধিক কারণে। টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয় এবং পরিবহন করতে হয়। এটা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর কোনো একটি পর্যায়ে তাপমাত্রার হেরফের হতে পারে। তাতে টিকার মান পড়ে যেতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শিশু যদি চরম অপুষ্টির শিকার হয় তবে টিকা কম কার্যকর হয়, অন্যদিকে বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, “ঠিক কোন কারণে টিকা কার্যকর হচ্ছে না, তা অনুসন্ধান জরুরি।”

উল্লেখ্য, ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ৭০ জন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন পর্যালোচনা দল হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ বিশ্লেষণ করে। সেখানে বলা হয়, ইপিআই-এর কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে। ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, “টিকার ব্যাপারে অন্ধ থাকা উচিত নয়। শিশুদের বিশুদ্ধ টিকা দিতে হবে। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়। পুরো ব্যবস্থার মধ্যে টিকার কার্যকারিতা যেন বজায় থাকে, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে।” এ বিষয়ে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

আইইডিসিআরের গবেষণায় দেখা গেছে বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তারা টিকার আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সোমবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, বহু দেশে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।” আইইডিসিআরের গবেষণার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, “এটি খুব ছোট গবেষণা, নমুনা কম। এই গবেষণার ফলাফল থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। আরও বড় গবেষণা দরকার।”

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে তিন হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে একটি বড় গবেষণা চলছে। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০টি করে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এর ফলাফল প্রকাশ করা হবে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন এবং ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের মধ্যে মোট ১ হাজার ২৩৩ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০৪ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ১ হাজার ১২৯ জন।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে নেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। টিকা দেওয়ার বয়সসীমাও বাড়াতে হবে। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। একপর্যায়ে তা ১৮ বছর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করতে হবে। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।”