দেশের শিশুদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের টিকা পাওয়ার হার ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। একটি স্বাধীন মূল্যায়নের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের টিকাদান ব্যবস্থার মান নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এবং টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। ওই মূল্যায়নে একটি বড় ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে—বাংলাদেশের কোনো জাতীয় টিকানীতি নেই। ২০১৩ সালে একটি খসড়া নীতি তৈরি করা হলেও তা এখন পর্যন্ত অনুমোদিত হয়নি।

গত বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই মূল্যায়নের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়। ৭০ জন বিশেষজ্ঞের এই দলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক মঞ্চ গ্যাভির প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পুরো দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার, যার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞরা নয়টি দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করেছেন। এর মধ্যে একটি দল কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এবং বাকি আটটি দল দেশের আটটি বিভাগে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অতীতে বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার লাভ করেছে। যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল তাদের পর্যালোচনায় দেখিয়েছে যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে টিকা কর্মসূচি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে বা হচ্ছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত প্রতিবেদন জমা দেবে এবং সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণ করবে।

মূল্যায়নে দেখা গেছে, দুর্বল স্থানীয় পরিকল্পনার কারণে প্রতিবছর টিকা পাওয়ার উপযুক্ত শিশুদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ টিকাদানের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ দল টিকার কোল্ড চেইনে গুরুতর সমস্যা শনাক্ত করেছেন। তারা কিছু স্থানে টিটেনাস-ডিফথেরিয়ার (টিডি) টিকা জমাট বাঁধা অবস্থায় পেয়েছেন। কোথাও টিকার ব্যবহারযোগ্যতার বিচারে দ্বিতীয় স্তরে পাওয়া গেছে। এছাড়া টিকা বিতরণের সময় তাপমাত্রা সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না এবং কোল্ড চেইন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যাপক অসংগতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

জনবলসংকটের বিষয়টিও এই মূল্যায়নে প্রকটভাবে উঠে এসেছে। ইপিআই-এর বর্তমান জনবলকাঠামো ১৯৮৫ সালের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত, যা বর্তমান বর্ধিত জনসংখ্যা ও জটিল পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে অনুমোদিত পদের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই বর্তমানে শূন্য। স্বাস্থ্য সহকারী, পরিদর্শক, ডেটা কর্মী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, স্টোরকিপার, কোল্ড–চেইন টেকনিশিয়ান এবং পোর্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবলের অভাব রয়েছে। এই সংকটের কারণে টিকাদানের স্থানীয় পরিকল্পনা, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা এবং টিকা সংরক্ষণ ও তদারকির মতো জরুরি কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে।

মূল্যায়নে আরও দেখা গেছে, কোনো প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ইপিআই-এর প্রস্তুতি এবং সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম।

বিসিজি, পেন্টা ৩ এবং হাম–রুবেলার টিকা পাওয়া শিশুদের 'পূর্ণ সুরক্ষিত' (ফুল্লি ইমিউনাইজড চিলড্রেন) হিসেবে গণ্য করা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এই পূর্ণ সুরক্ষিত শিশুর হার কমছে। ২০১৬ সালে এই হার ছিল ৮২.৩ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে বেড়ে ৮৩.৯ শতাংশে পৌঁছালেও ২০২৩ সালে তা পুনরায় কমে ৮১.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হাম–রুবেলার টিকা থেকে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলে হাম–রুবেলার সুরক্ষায় এক বিশাল শূন্যতা বা 'ইমিউনাইজেশন গ্যাপ' তৈরি হয়েছে। একই ধরনের শূন্যতা দেখা গেছে হুপিং কাশি ও ডিফথেরিয়ার ক্ষেত্রেও।

সব শিশুকে টিকা দিতে না পারার এই ব্যর্থতারই ফল হিসেবে ২০২৬ সালে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের এই প্রাদুর্ভাব একটি সতর্কবার্তা বা পরীক্ষা। যদি এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে হুপিং কাশি ও ডিফথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘটা কেবল সময়ের ব্যাপার। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল কিছু সুপারিশ প্রদান করেছে।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে করণীয় হিসেবে তারা টিকাদানের স্থানীয় পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ওয়ার্ডভিত্তিক করার কথা বলেছে, যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে। পাশাপাশি শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

মধ্যমেয়াদী বা ৬ থেকে ২৪ মাসের পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞ দল জানিয়েছে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলপত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় টিকা কৌশলপত্র হালনাগাদ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া জেলা ও তার নিচের স্তরে সমন্বয় ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শহরাঞ্চলে টিকাদানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং স্কুলে ভর্তির আগে শিশুর টিকাদান যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার বর্তমান সংস্কারের সাথে মিল রেখে ইপিআই-এর জনবলকাঠামো তৈরি করা, সব কর্মকাণ্ডকে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) আওতায় আনা এবং সব স্তরের কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

হাম-রুবেলা ও পোলিও পরীক্ষাগার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনার পাশাপাশি নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে পৃথক স্বাস্থ্যকর্মী দল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষার ব্যবস্থা শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে পাইনি। প্রতিবেদন নিয়ে আমরা জনস্বাস্থ্যবিদ ও নাইট্যাগের সঙ্গে বসব। ইতিমধ্যে শূন্য পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা টিকাদানকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। খোলা স্থানে, সূর্যের আলো বেশি বা তাপমাত্রা বেশি, এমন স্থানে আর টিকাকেন্দ্র রাখা হবে না। এ ছাড়া টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করতে “বাফার স্টক” গড়ে তোলার আলাদা পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”