শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির বিলম্বকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল। আন্তর্জাতিক ও দেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এই দলটি জানিয়েছে, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের সাড়াও ছিল অপর্যাপ্ত। তারা শিশুদের টিকাদানে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যর্থতা খুঁজে পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের দলটি সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হুপিং কাশি ও ডিফথেরিয়ার মতো অন্যান্য মারাত্মক রোগেরও প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে তারা টিকাদানে স্থানীয় পরিকল্পনার ঘাটতি সংশোধন, জনবলের শূন্য পদ পূরণ এবং টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই মূল্যায়নের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, টিকা সরবরাহ ও বিতরণের বৈশ্বিক জোট গ্যাভির প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইপিআইয়ের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল (জয়েন্ট ইনডিপেনডেন্ট রিভিউ টিম) দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, টিকার বর্তমান পরিস্থিতি এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয় অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্জন ও সুনাম টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং হামের এই প্রাদুর্ভাব তার একটি স্পষ্ট সতর্কতা।

মূল্যায়ন দলের প্রধান ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার বলেন, “২০২৬ সালে প্রাদুর্ভাবের আগে শিশুদের মধ্যে ইমুনাইজেশন গ্যাপ (রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি) তৈরি হয়েছিল। নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে প্রতিবছর কমবেশি ২০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল—এই পাঁচ বছরে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু হামের টিকা পায়নি। ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়।”

আন্তর্জাতিক ও দেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই মূল্যায়ন দলে মোট নয়টি উপদল ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল জাতীয় দল এবং বাকি আটটি ছিল বিভাগীয় দল। প্রতিটি বিভাগীয় দল দুটি করে জেলার দুটি করে উপজেলার তথ্য সংগ্রহ করেছে। দলগুলো টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শন, কেন্দ্র থেকে ফেরত যাওয়া মায়েদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, সদ্য মা হওয়া ১০ জন মায়ের সঙ্গে কথা বলা, স্কুল ও মাদ্রাসা পরিদর্শন এবং পাঁচটি করে পরিবারে মা ও মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেছে। মোট ৭০ জনের এই দলটি গত ৩ অক্টোবর থেকে তাদের কাজ শুরু করে।

গতকালকের অনুষ্ঠানটি মূলত একটি কর্মশালা ছিল, যেখানে অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের প্রধান ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার। এই জনস্বাস্থ্যবিদ যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ২০ বছরের বেশি সময় কাজ করেছেন। এছাড়া আটটি বিভাগীয় দলের পক্ষ থেকেও পৃথক আটটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন শিশুদের টিকার মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “শিশুদের যে টিকা দেওয়া হচ্ছে, সেই টিকার মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া দরকার। কোথায় টিকা তৈরি হচ্ছে, সেখান থেকে টিকা কোন গুদামে যাচ্ছে, গুদাম থেকে কোন ফ্লাইটে করে কেমন বিমানবন্দরে আনা হচ্ছে, বন্দর থেকে কীভাবে টিকা জেলা পর্যায়ে যাচ্ছে, টিকাকেন্দ্রগুলোতে তা কীভাবে পৌঁছাচ্ছে—এই পুরো ব্যাপারটিতে ‘কোল্ড চেইন’ ঠিক থাকছে কি না, তা জানা দরকার।” তিনি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশে আরও বলেন, “আমরা ধারণা করি টিকার মান ঠিক আছে। এটা ধারণা। কিন্তু আমি আপনাদের অনুরোধ করি, টিকার মানও যাচাই করা দরকার।”

মূল উপস্থাপনায় ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচির ইতিহাস এবং কোন রোগ প্রতিরোধে কোন টিকা দেওয়া হয় তার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারাই হামে আক্রান্ত হয়েছে, যারা টিকা পায়নি। স্বাধীন মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, সব শিশু টিকা না পাওয়ার ঘটনা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেমন ছিল, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তা বিদ্যমান ছিল।

ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার পুনরায় উল্লেখ করেন, “২০২৬ সালে প্রাদুর্ভাবের আগে শিশুদের মধ্যে ইমুনাইজেশন গ্যাপ (রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি) তৈরি হয়েছিল। নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে প্রতিবছর কমবেশি ২০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল—এই পাঁচ বছরে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু হামের টিকা পায়নি। ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়।”

তিনি তাঁর উপস্থাপনায় দেখান যে, সর্বশেষ হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালে। পরবর্তী ক্যাম্পেইন ২০২৪ সালের জন্য নির্ধারিত থাকলেও তা হয়নি। ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি, বরং ওই বছর টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন করা হয়। হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়। এই বিলম্বই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া দেশের অধিক জনঘনত্ব এবং সামাজিক জমায়েতকেও প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, টিকা দেওয়া হচ্ছে ৯ মাস বা তার বেশি বয়সীদের, কিন্তু ৯ মাসের কম বয়সীরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে স্বাধীন দল জানিয়েছে, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ ছিল অপর্যাপ্ত এবং সাড়া দিতে অনেক দীর্ঘ সময় লেগেছে। সরকার ঝুঁকিতে থাকা সব মানুষকে টিকার আওতায় আনেনি, বিশেষ করে ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের বাইরে রাখা হয়েছে।

সরকারের দেওয়া হাম রোগীর হিসাবের বিষয়েও উপস্থাপনায় প্রচ্ছন্ন সমালোচনা দেখা যায়। ১২ অক্টোবর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ৯৩ হাজার ৮৫২ জনের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে ৬৮ হাজার ৮৬৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে, যা প্রায় ৭৩ শতাংশ। অথচ সরকারের হিসাবে এই হার অনেক কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন ২ লাখ ৮ হাজার ৫৭০ জন রোগীর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৮৪০ জন, যা মাত্র ১১ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, গতকাল হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে এ বছর হামে মোট ১ হাজার ১৭৭ জনের মৃত্যু হলো।

মূল্যায়ন দলে বলা হয়, স্থানীয় পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে দেশের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু পদ্ধতিগতভাবে টিকা থেকে বাদ পড়ছে। একজন টিকাকর্মীকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি রেকর্ড সংরক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের কাজ করতে হয়, যা চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া টিকা কর্মসূচিতে পুষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং কোনো দুর্ঘটনা বা সমস্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি তেমন নেই।

স্বাধীন মূল্যায়ন দল সতর্ক করে বলেছে, বাংলাদেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার সতর্কবার্তা হলো এই হামের প্রাদুর্ভাব। এটি একটি পরীক্ষা। জরুরি পদক্ষেপ না নিলে হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়ার পাশাপাশি পোলিও ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইপিআই-এর জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, কোল্ডচেইন টেকনিশিয়ানদের ৫৩ শতাংশ, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিদর্শকের ৩৪ শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ৪৫ শতাংশ পদ খালি। শহর এলাকার ৯০ শতাংশ টিকাকর্মী এনজিওর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত, যাদের ওপর নজরদারি ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। এছাড়া ২০২৫ সালে টিকাকর্মীদের কর্মবিরতির কারণে সাত মাস কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল।

সুপারিশ করা হয়েছে যে, টিকা দেওয়ার স্থানীয় পরিকল্পনা ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত নতুনভাবে করতে হবে। শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, বয়সের সীমা বাড়ানো এবং টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাভির সহায়তার মেয়াদ শেষ হলে কীভাবে টিকা কেনা হবে, সেই পরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। এছাড়া স্কুলে ভর্তির সময় শিশুর সব টিকা নেওয়া আছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করার সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সিভিল সার্জনদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এস এম জিয়া উদ্দিন হায়দার বলেন, সিভিল সার্জনরা সমস্যাগুলো ঠিকমতো জানেন। তারা নিজ নিজ জেলায় টিকার কাজ ঠিকঠাক করলে সমস্যা অনেক দূর হবে।

বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গ্যাভির প্রতিনিধি ডিয়ার্ক গেহল বলেন, শহর এলাকায় অনেক মানুষ টিকার বাইরে থাকে, যা সহজে বোঝা যায় না। তাই সেখানে কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ইউনিসেফের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিনিধি গ্লিইয়ান মোলসোপ বলেন, বাংলাদেশের উজ্জ্বল ইতিহাস থাকার পরও ২০২৬ সালের ঘটনাটি দুঃখজনক। তিনি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার পরামর্শ দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল বলেন, কয়েক দশকের দৃঢ় ভিত্তিকে এখন আধুনিকায়ন করা জরুরি।

গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী জিয়া উদ্দিন হায়দার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিগত সময়ে শিশুদের টিকাদানে যেসব ঘাটতি ছিল, ভবিষ্যতে সেগুলো যেন না হয়, সে বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।”