ভারতের দিল্লির সংখ্যালঘু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি অবশেষে মেনে নিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে এই ঘোষণার পর দুই সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখনই স্তিমিত হবে না বলে জানিয়েছে তাঁদের সংগঠন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মাহতাব আলম রিজভী আজ সোমবার জানান, ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করতে রাজি হয়েছে। এর পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিলের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মাহতাব আরও জানান, ছাত্র সংসদের সংবিধান অনুমোদন করার পর আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীদের যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তবে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা এই প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বিভ্রান্তিকর এবং তা লিখিতভাবে দেওয়া হয়নি। ফলে জামিয়ার এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তারা জানিয়েছেন।

ঐতিহাসিক এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯২০ সালে প্রথম উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে তা দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘ডিমড’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের পর থেকে জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়াতে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এই নির্বাচনসহ আরও বেশ কিছু দাবির ভিত্তিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের হলেও এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অধ্যয়ন করেন।

১২ অক্টোবর থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতির অবনতি হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত শনিবার থেকে ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কলকাতার একাধিক শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে জানান, ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের ভেতরেই আটকে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক, কারণ সেখানে খাবার-দাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই এবং বাইরে থেকেও খাবার আনতে দেওয়া হচ্ছে না।

ক্যাম্পাসে বর্তমানে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিজেদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পাঁচজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের গালিব লনে অনশন শুরু করেন। আজ সকালে রেজিস্ট্রার রিজভী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাবতীয় প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা বললেও তাঁরা এখনো অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রশাসন ইতিমধ্যেই তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারসহ বেশ কিছু আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এই বিষয়েও শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট জবাব চেয়েছেন।

গত ১৭ অক্টোবর ভোরে আন্দোলনকারীদের বলপ্রয়োগ করে সরানোর চেষ্টা করে সরকার, যার ফলে বিক্ষোভের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়। গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ নম্বর গেটের কাছে নিরাপত্তাকর্মীরা বিক্ষোভকারীদের তাঁবু ও ব্যানার সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা মানবশৃঙ্খল গড়ে তুলে তীব্র প্রতিরোধ জানান। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির পর অনশনরত শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ‘গুলস্তাঁ-ই-গালিব’ ভবনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

আন্দোলন ভাঙতে এবং পরিস্থিতি সামলাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনসারি অডিটোরিয়ামে শিক্ষক ও কর্মীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন। অনশনরত অসুস্থ শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নিতে দুটি অ্যাম্বুল্যান্স ডাকা হলেও শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। শিক্ষার্থীরা কেবল ছাত্র সংসদ চালুর দাবিই জানাচ্ছেন না, তাঁরা অবিলম্বে নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং প্রধান প্রক্টর ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার অপসারণের দাবিও তুলেছেন।

গত শুক্রবার কংগ্রেস দলীয় সংসদ সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ী এবং ইমরান মাসুদ শিক্ষার্থীদের সমর্থনে ক্যাম্পাসে আসেন। ইমরান মাসুদ দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকলে তাঁদের দুজনকেই পুলিশ আটক করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এই রাজনৈতিক উপস্থিতি ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করছে।

অন্যদিকে, রাসায়নিক বিজ্ঞান বিভাগের দেয়ালে ‘ফ্রি কাশ্মীর’ ও ‘ফ্রি শারজিল ইমাম’-এর মতো গ্রাফিতি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এর দায় অস্বীকার করে এটিকে আন্দোলনকে কলঙ্কিত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ধরনের স্লোগানকে তাঁদের ঐতিহ্যের জন্য হুমকি বলে নিন্দা জানিয়েছে।