সিলেট জেলা প্রশাসনের এলআর ফান্ডের আয়-ব্যয়ের হিসাব, তহবিলে অর্থ প্রদানকারীর তালিকা এবং ব্যয়ের খাত জানতে প্রায় চার মাস আগে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিলেন মুক্তকণ্ঠের একজন নিজস্ব প্রতিবেদক। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথমে জানানো হয়, এই বিষয়টি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পড়ে না।

পরবর্তীতে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করা হলে তিনি স্পষ্ট জানান যে, এসব তথ্য প্রদানে আইনগত কোনো বাধা নেই। একই সঙ্গে তিনি জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন বিধি অনুযায়ী আবেদনটি নিষ্পত্তি করতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই নির্দেশের ৩৮ দিন পর জেলা প্রশাসন নতুন করে জানায়, ‘এলআর ফান্ড’ নামে কোনো তহবিল বা হিসাব তাদের কার্যালয়ে নেই, যার ফলে তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, এলআর ফান্ড হলো স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান বা চাঁদা হিসেবে সংগৃহীত অর্থের একটি বিশেষ তহবিল। ভিআইপিদের (অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) আপ্যায়ন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং মাঠ প্রশাসনের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহৃত হয়। দেশের প্রতিটি জেলাতেই এই ধরনের তহবিল বিদ্যমান।

দুই দফায় দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী জবাব দেওয়ার বিষয়টিকে ‘তথ্য গোপনে লুকোচুরি’ বলে অভিহিত করেছেন সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রথম দফায় বলা হচ্ছে, তথ্য অধিকার আইনের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে তাঁরা তথ্য দেবেন না। পরে আপিল শুনানি শেষে বলছেন, হিসাব তাঁদের কাছে নেই। এখানে শুভংকরের ফাঁকি আছে।”

তিনি আরও বলেন, “এলআর ফান্ডের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে যেসব কথা প্রচলিত আছে, তথ্য না দেওয়ায় সেসব অভিযোগের পক্ষেও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছতার স্বার্থে এই তহবিলের আয়-ব্যয়ের যাবতীয় হিসাব প্রকাশ করা দরকার।”

গত জুন মাসে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে ৫ লাখ টাকা দান করার একটি ঘটনার পর এলআর ফান্ড ব্যবহারের নিয়ম-অনিয়ম ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ জুন তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় সিলেট জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং তথ্য ও অভিযোগ শাখার সহকারী কমিশনার লাবন্য ইসলামের কাছে নিয়ম মেনে আবেদন করা হয়। কিন্তু ১৫ জুলাই পাঠানো লিখিত জবাবে তিনি জানান, এলআর ফান্ড ‘স্থানীয় তহবিল’ হওয়ায় এ–সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার বিষয়টি তথ্য অধিকার আইনের আওতাভুক্ত নয়।

তথ্য অধিকার আইনে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়, যেমন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে এমন তথ্য। তবে এসব ব্যতিক্রমের বাইরে আবেদন করলে সাধারণত ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। একাধিক কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থাকলে এই সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে।

আবেদনকারী ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য ছয় ধরনের তথ্য চেয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল: এলআর ফান্ডে মোট জমার পরিমাণ, মোট ব্যয়ের পরিমাণ, অর্থ প্রদানকারীদের পরিচয়, ব্যয়ের খাত, অতিথি আপ্যায়নে ব্যয় এবং সিলেট সার্কিট হাউসের অবকাঠামো উন্নয়ন বা আসবাব কেনায় এই তহবিলের অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার পরিমাণ ও খাত।

জেলা প্রশাসনের প্রথম জবাবের পর ২০ জুলাই সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমানের কাছে আপিল করা হয়। ৩০ জুলাই আপিল শুনানির পর বিভাগীয় কমিশনার লিখিত আদেশে বলেন, “তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এ বর্ণিত তথ্যের সংজ্ঞা এবং আইনের ৭ ধারায় যেসব তথ্য প্রকাশ বা প্রদান বাধ্যতামূলক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে এলআর ফান্ড-সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ নেই। তাই আপিলকারীর চাহিত তথ্য দিতে আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।”

বিভাগীয় কমিশনার আবেদনটি বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। ওই আদেশের অনুলিপি ১২ আগস্ট ই-মেইলে এবং ১৮ আগস্ট ডাকযোগে পাঠানো হয়। তবে আদেশের ৩৮ দিন পর, ৭ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লাবন্য ইসলাম ই-মেইলে জানান, আবেদনে উল্লেখিত এলআর ফান্ড নামীয় কোনো তহবিল কিংবা হিসাব অত্র কার্যালয়ে না থাকায় বিস্তারিত তথ্য প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তীতে একই চিঠি ডাকযোগে পাঠানো হয়।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস যথাযথ মর্যাদায় উদ্‌যাপন, প্রটোকল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য “আগ্রহী ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে প্রয়োজনীয়তা সাপেক্ষে সহযোগিতা গ্রহণ করা হয় এবং তা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয়।”

বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে আইনগত বাধা নেই বলা হলেও জেলা প্রশাসন চাওয়া ছয়টি তথ্যের একটিও প্রদান করেনি। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পেলে বা অস্বীকৃতি জানানো হলে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে এবং এরপরও প্রতিকার না মিললে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করা যায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধান তথ্য কমিশনার ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর তথ্য কমিশনের কার্যক্রম স্থবির ছিল। দীর্ঘ দুই বছর পর ১৭ অক্টোবর প্রধান তথ্য কমিশনার পদে নিয়োগ পান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান। এই তিন সদস্যের কমিশনে আরও নিয়োগ পেয়েছেন এস এ এম মাহফুজুর রহমান ও খান মোহাম্মদ আবুল হোসেন।

এলআর ফান্ডে বছরে কত টাকা জমা হয় এবং কারা টাকা দেন, তা জানতে সিলেট জেলা প্রশাসনের সাবেক দুই পদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, সিলেটে জেলা প্রশাসনের এলআর ফান্ডে প্রতিবছর ২ থেকে ৩ কোটি টাকা জমা হয়। পাথর কোয়ারিগুলো চালু থাকলে এই পরিমাণ আরও বেশি হতো। তাঁদের ভাষ্যমতে, তহবিলের হিসাব জেলা প্রশাসনের নেজারত শাখায় সংরক্ষিত থাকে এবং প্রতিবছর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার অভ্যন্তরীণভাবে এই হিসাব নিরীক্ষা করেন।

তাঁরা আরও জানান, বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী, প্রবাসী, লাইসেন্সধারী অস্ত্রের মালিক, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান বা চাঁদা হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করে এই তহবিল গঠন করা হয়।

আবেদন করেও তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি বর্তমান জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে জানালে তিনি বলেন, “আপনাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এর বাইরে আমার কোনো বক্তব্য নেই।”

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি ও প্রবীণ আইনজীবী সৈয়দা শিরিন আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এলআর ফান্ডের তথ্য লুকানোর কোনো সুযোগ নেই। তথ্য অধিকার আইনে জেলা প্রশাসন এ তথ্য জানাতে বাধ্য। তথ্য দিতে লুকোচুরি কিংবা টালবাহানা অনিয়মের বিষয়টিই পাকাপোক্ত করে।