গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদ্রাসার সাত বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষক মুসলিম আহম্মেদের (৩০) জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছে আদালত।

আজ রোববার গাজীপুরের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ওমর হায়দার শুনানির পর জামিন আবেদনটি নাকচ করে অভিযুক্ত শিক্ষককে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন আদালতের পরিদর্শক আহসানুল্লাহ চৌধুরী জামিন নামঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অভিযুক্ত মুসলিম আহম্মেদ টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভুক্তভোগী শিশুটি ওই মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগের মুখে গত বুধবার ওই শিক্ষককে গণপিটুনির পর পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। গত বৃহস্পতিবার ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শিক্ষককে আদালতে হাজির করা হয়। একই দিন বিকেলে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিশুটির জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।

ঘটনার তদন্তের অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার পুলিশ টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করে। সেখান থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ঘটনার পর থেকে শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে অনীহা প্রকাশ করছিল। পরিবারের সদস্যরা কারণ জানতে চাইলে প্রথমে সে কিছু না বললেও, পরবর্তীতে মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদে পুরো ঘটনাটি খুলে বলে। এরপর ২১ অক্টোবর (বুধবার) দুপুরে শিশুটির স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হয়ে শিক্ষককে মারধর শুরু করেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে শিশুটির বাবা মামলা করেন।

অন্যদিকে, এই ঘটনায় ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলমাছ হোসেন। তাঁর অভিযোগ, শিশুটির বাবার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল মাদ্রাসায় ঢুকে শিক্ষককে মারধর করেছে। তাঁকে বাঁচাতে গেলে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও হামলার শিকার হন। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময় মাদ্রাসার কার্যালয় ভাঙচুর করা হয় এবং ১৭ লাখ টাকা ও ৫টি মুঠোফোন লুট করা হয়। এই বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ থানায় পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছে।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিশুটির বাবা এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি দাবি করেন, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে তিনি মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন; কোনো ধরনের ‘মব’ সৃষ্টি করতে নয়। মাদ্রাসায় ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

শিক্ষককে মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। বর্তমানে পুলিশ শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করছে।