পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামক একটি সংগঠনের ডাকা অবরোধ চলাকালীন সড়কে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মোটরসাইকেলে করে এক পাহাড়ি তরুণ বন্দুক হাতে সড়কে মহড়া দিচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের গুইমারা জোড়া ব্রিজ এলাকায় সড়কের একটি অংশ আগুন দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল এবং সেখানেই এই অস্ত্র হাতে মহড়ার ঘটনাটি ঘটে।
রাঙামাটির সাজেকে সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগের প্রতিবাদে এই কর্মসূচি পালিত হয়। সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে আজ শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধ দিবস অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই অবরোধের কথা জানান সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমা।
ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সড়কের দুই পাশে একদল তরুণের অবস্থান। সেই সময় একটি মোটরসাইকেলে করে তিন পাহাড়ি তরুণ আগুনের অংশটি পার হয়ে যান। তাঁদের মধ্যে পেছনে বসা তরুণের হাতে একটি বন্দুক ছিল। ওই তরুণের পরনে ছিল কালো টিশার্ট ও হাফপ্যান্ট।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মোটরসাইকেলটি মূল সড়ক থেকে পাশের একটি গ্রামীণ রাস্তার দিকে মোড় নেয়। সেখানে আগে থেকেই আরেকটি মোটরসাইকেলে তিনজন তরুণ উপস্থিত ছিলেন এবং আরও বেশ কয়েকজন তরুণকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যায়। এরপর বন্দুকধারী তরুণ ও তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক আরোহী মোটরসাইকেল থেকে নেমে যান এবং দুটি মোটরসাইকেলই সেখান থেকে চলে যায়। তবে বন্দুক হাতে থাকা তরুণটি অন্য তরুণদের সাথেই থেকে যান।
এই বিষয়ে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যে সংগঠনটি অবরোধ ডেকেছে, তাদের পেছনে আছে ইউপিডিএফ। ইউপিডিএফ সশস্ত্র দল। তাদের কাছে অস্ত্র থাকতে পারে।’ তবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি তাঁর নজরে আসেনি বলে জানান তিনি। পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘আতঙ্ক ছড়াতে অনেক সময় পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে দিতে পারে দলটি। ভিডিওটি নজরে এলে তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে, তা কবেকার।’
পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান আরও জানান, অবরোধ চলাকালীন জেলার বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছ কেটে সড়ক বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করে। অবরোধ চলাকালে কোনো ধরনের নাশকতা বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ অস্ত্র নিয়ে আন্দোলন করে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বন্দুকধারীর ভিডিওর সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের অর্ধদিবস অবরোধের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’
উল্লেখ্য, গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। এটি ছিল ওই দুই সংগঠনের তৃতীয়বারের মতো অবরোধ কর্মসূচি। তাঁদের অন্যতম দাবি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু লারমা সমর্থিত জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া।
তবে জেএসএস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের অবরোধ ঘোষণার পর নিরাপত্তাঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি বন্ধ রাখার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যটকেরা ফিরতে শুরু করলেও উজোবাজার এলাকায় তাঁরা অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন।
পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় পর্যটকদের গাড়িবহর এগিয়ে যায়। এরপর বেলা ১১টার দিকে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন। তবে ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।