পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সড়ক ও নৌপথে ডাকা অর্ধদিবস অবরোধ কর্মসূচি শেষ হয়েছে। ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামক একটি সংগঠনের আহ্বানে আজ শনিবার ভোর থেকে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, যা দুপুর ১২টায় সমাপ্ত হয়। সংগঠনটির দাবি, সাজেকে সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানাতে এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
দুপুর ১২টায় কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর থেকে দুই জেলার সড়ক যোগাযোগ পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অবরোধ চলাকালীন কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে এবং গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন। দুপুর ১২টার পর থেকে রাস্তায় আর কোনো অবরোধকারীকে দেখা যায়নি।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী স্কয়ার এলাকায় শামিমা আক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি সকাল থেকেই গাড়ি চলাচলের অপেক্ষায় ছিলেন। পানছড়ি থেকে খাগড়াছড়িতে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল তাঁর। অবরোধ শেষ হওয়ায় তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে, শহরের নারকেলবাগান এলাকার শান্তি কাউন্টারে চট্টগ্রাম যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন সুমাদ্রী চাকমা। তিনি জানান, সকালে তাঁদের চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা থাকলেও অবরোধের কারণে তা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে অবরোধ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি এখন আশাবাদী। বেলা ১টার পর চট্টগ্রামের বাসে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কায় কিসলু বলেন, “কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শহর ও শহরের বাইরের কিছু এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিংয়ের চেষ্টা করেছিলেন অবরোধকারীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গেলে তাঁরা সেখান থেকে পালিয়ে যান।”
অবরোধ চলাকালে খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী ব্রিজ ও স্বনির্ভর এলাকা, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কৃষি গবেষণা এলাকা এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের গুইমারা জোড়াব্রিজ এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপমারা এলাকায় গাছ কেটে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল।
রাঙামাটির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শহরের বনরূপা ও কল্যাণপুর বাজারসহ অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কেও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল অব্যাহত ছিল। তবে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে সকাল থেকে যান চলাচল বন্ধ ছিল। সাপছড়ি খামারপাড়া ও কুতুকছড়ি ধর্মঘর এলাকায় অবরোধকারীরা গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করেন। এছাড়া কুতুকছড়ি হাফ বাজার থেকে ধর্মঘর পর্যন্ত একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। দুপুর ১২টার পর এই সড়কেও যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
রাঙামাটি-চট্টগ্রাম বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুপ জানান, অবরোধের কারণে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। দুপুর ১২টার পর অবরোধ তুলে নেওয়ায় বাস চলাচল শুরু হলেও যাত্রীর সংখ্যা কম ছিল।
নৌপথের বিষয়ে রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির লাইনম্যান বিশ্বজিৎ দে জানান, নৌপথে অবরোধের কোনো প্রভাব পড়েনি এবং লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
কর্মসূচির ডাক দেওয়া ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, “তাঁদের আহ্বানে ডাকা অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হয়েছে। ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মসূচি ছিল। সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবি ও অধিকার উপেক্ষা করা হলে এবং তাঁদের ওপর লাঠিপেটা ও গুলিবর্ষণের মতো ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।” তিনি জানান, আপাতত অবরোধ কর্মসূচি শিথিল করা হয়েছে।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব জানান, অবরোধকে কেন্দ্র করে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কয়েকটি স্থানে অবরোধকারীরা ব্যারিকেড দিলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যান ও সাংবাদিকদের গাড়িকে অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হয়েছিল।
এর আগে গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। এটি ছিল ওই দুই সংগঠনের তৃতীয় দফা অবরোধ। তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু লারমা–সমর্থিত জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া।
তবে জেএসএস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে।”
বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের অবরোধ ঘোষণার পর নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করলেও ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় তাঁরা অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন।
পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দিলে পর্যটকদের গাড়িবহর এগিয়ে যায়। এরপর বেলা ১১টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন। তবে ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার বেলা একটার দিকে সাজেকে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়।