নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রায় সব ক্যাডারের ডিপিসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং পদোন্নতির জিও জারি করা হয়েছে। অনেক ক্যাডারে একাধিক স্তরে পদোন্নতি হয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেকর্ডসংখ্যক সুপারনিউমারারি পদ সৃজন করা হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের বাইরে রয়ে গেছে শিক্ষা ক্যাডার। চলতি বছরের ৩০ জুন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর নিকট একটি স্মারকলিপির মাধ্যমে ২৪ থেকে ৩৮তম ব্যাচের যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, বিশেষ ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং পদসংকট দূর করতে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়।
প্রভাষকদের পদোন্নতির লক্ষ্যে ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর তিন কর্মদিবস ধরে ডিপিসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২১ তারিখের পর হুতিদের ব্যালিস্টিক মিসাইল হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের জিও পলিটিক্যাল পাওয়ার ডাইনামিকসে আমূল পরিবর্তন এসেছে, পদ্মা-মেঘনায় হাজারো কিউসেক জল গড়িয়েছে, শত শত আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রগুলো থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছেছে; কিন্তু শিক্ষকদের পদোন্নতি ডিপিসি থেকে জিও পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তবে সম্প্রতি অধিকার সচেতন ৪৯তম ব্যাচের নবীন কর্মকর্তারা ১৩ অক্টোবর বগুড়ায় ‘বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা সবচেয়ে বেশি হতাশায় ভুগছেন’ বলে মন্তব্য করে যোগদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দৃষ্টি আর্কষণ করেন। শিক্ষামন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালককে উদ্দেশ করে বলেন, “নোটেড ডাউন ক্লিয়ারলি অ্যান্ড পুট ইট ইন দ্য ফাইল, হোয়াট দে ডিমান্ড।” অর্থাৎ তাদের দাবিগুলো স্পষ্টভাবে নোট করে ফাইলে রাখতে বলেন তিনি। জাতীয় দৈনিক মারফত মন্ত্রী মহোদয়ের তৎপরতা মুহূর্তে কর্মকর্তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও পূজার আগে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তাঁরা মর্মাহত।
সরকারি আদেশ বা জিও জারি না হওয়ার কারণ হিসেবে শূন্য পদের সংকট এবং সুপারনিউমারারি পদ সৃজন না হওয়াকে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রভাষক পর্যায়ের কর্মকর্তার সংখ্যা ৯ হাজার ৭৮২ জন। বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে পদ রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৫১টি। অর্থাৎ প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সাংগঠনিক সুযোগ রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৫১ কর্মকর্তার। বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার জন্য প্রথম পদোন্নতির পথই কার্যত বন্ধ। শিক্ষা কার্যক্রমের গুণগত মান রক্ষা, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা, কর্মকর্তাদের হতাশা দূর করা এবং পদোন্নতিবঞ্চনা নিরসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রয়াত অধ্যাপক বি এম আবদুল হান্নান স্বাক্ষরিত চিঠিতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে ২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
গত জানুয়ারিতে প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, ৩২তম, ৩৩তম, ৩৪তম, ৩৫তম, ৩৬তম ও ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তাসহ সরকারি কলেজ জাতীয়করণ বিধিমালা ২০০০-এর আওতায় আত্তীকৃত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মোট ২ হাজার ৮২৩ জন প্রভাষক সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য ছিলেন, এরই মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা বিদ্যমান পদের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শূন্য পদ নেই। সাম্প্রতিক ডিপিসি সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলেছেন, পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে হলে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।
এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, যখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন যে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি অপরিহার্য, তখন সেই পদ সৃষ্টির ফাইলটি কোথায় আটকে আছে? কাদের অবহেলায় হাজারো শিক্ষক কর্মকর্তার যাপিত জীবন জেরবার? কারণ, সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব নতুন কোনো বিষয় নয়। গত ৪ জানুয়ারি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এরপর ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারাও পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন। প্রস্তাব পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকের দায়িত্বে রদবদল হয়েছে। সময় গড়িয়েছে, ব্যাচের পর ব্যাচ পদোন্নতির যোগ্য হয়েছে; কিন্তু ২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির সেই ফাইল এখনো আলোর মুখ দেখেনি। অর্থাৎ একদিকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি দিতে হলে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির বিকল্প নেই, অন্যদিকে সেই পদ সৃষ্টির ফাইলই যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকে, তাহলে পদোন্নতি আটকে থাকার দায় থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি সত্যিই নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারে?
বিসিএস প্রশাসনসহ অন্যান্য অনেক ক্যাডারে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ কর্মকর্তারা নিয়মিত ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। বিপরীতে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে বিগত পাঁচ বছরে কেবল একবার ষষ্ঠ গ্রেডে কোনো পদোন্নতি হয়েছে। একই বিসিএস ব্যাচে, একই দিনে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও সিনিয়র স্কেল অর্জনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অভিন্ন প্রক্রিয়া থাকলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ক্যাডারভেদে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল একটি ব্যাচের পদোন্নতি নয়। একই বিসিএস ব্যাচের যোগ্য কর্মকর্তাদের অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়ার একটি প্রতিষ্ঠিত কাঠামো প্রয়োজন। ৩৬তম বিসিএসের সমসাময়িক অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ২০২৩ সালে, ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৪ সালে এবং ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৬ সালে নিয়মিতভাবে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬-৩৮তম কর্মকর্তারা এখনো নবম গ্রেডের প্রভাষক পদে রয়েছেন।
থিঙ্কট্যাংক অব সিভিল এডুকেশন ‘দ্য অ্যাডভাইজরস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং পদোন্নতি বঞ্চিত ৩৬ ব্যাচের প্রভাষক সচিব তালুকদার বলেন, “শিক্ষক দিবস, পূজা কিংবা ঈদ—সব উৎসবের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে পদোন্নতি বঞ্চনা। বিসিএসের প্রাক্-নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর সিভিল সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তারা আজও প্রভাষক অথচ ১৩ ব্যাচ জুনিয়র ৪৯তম বিসিএসের নতুন কর্মকর্তারাও একই প্রভাষক পদে এসে যোগ দিচ্ছেন। জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তা একই পদে বছরের পর বছর আটকে থাকার এই অবিশ্বাস্য প্রশাসনিক বাস্তবতা আমাদের সামাজিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সরকারের এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং প্রাথমিকের শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানের তৎপরতার ছোঁয়া বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের লাগবে বলে আমরা আশাবাদী।” তবে তিনি আরও বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন, ‘পদোন্নতির ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্র পল্লীতে, শিক্ষা ক্যাডারে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’”
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখা থেকে দুটি পৃথক স্মারকে ডিপিসি সভা আহ্বান করা হয়। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড, বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেডে প্রাপ্যতার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল। ২৭ জুলাই সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা আর হয়নি। কালক্ষেপণের পর ডিপিসি হয়েছে অদ্যাবধি জিও হয়নি; কিন্তু সরকার ও মন্ত্রী সবাই তো শিক্ষা নিয়ে তৎপর। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কার উদাসীনতায় এই সরকারের আমলে পদোন্নতি বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা? তবে কি কেউ অলক্ষ্যে শিক্ষা ক্যাডারকে উসকে দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরিতে সচেষ্ট?