শীতের আগমনের আভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চুয়াডাঙ্গায় শুরু হয়ে গেছে খেজুরের রস সংগ্রহের ব্যাপক প্রস্তুতি। জেলার মাঠের প্রান্তরে এবং রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরগাছগুলোর পরিচর্যায় এখন চরম ব্যস্ততায় কাটছে গাছিদের সময়। গাছের চাঁচ দেওয়া থেকে শুরু করে নলি স্থাপন এবং মাটির হাঁড়ি বসানোর যাবতীয় প্রস্তুতি চলছে, যা শীতকালীন রস সংগ্রহের মৌসুমকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে এক নতুন কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর থেকেই খেজুরগাছের পরিচর্যার কাজে মগ্ন রয়েছেন গাছিরা। কোমরে মোটা দড়ি এবং বাঁশের ঝুড়ি বেঁধে তার ভেতর বাটাল ও ধারালো হাঁসুয়া নিয়ে তারা গাছে উঠছেন। গাছের জমে থাকা ময়লা এবং অপ্রয়োজনীয় ডালপালা পরিষ্কার করে গাছগুলোকে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
দামুড়হুদা উপজেলার লোকনাথপুর গ্রামের গাছি নাজিম উদ্দিন জানান, “ইতিমধ্যে গাছের প্রথম দফার চাঁচ দেওয়া শুরু হয়েছে। আরও দুই দফা চাঁচ দেওয়ার পর গাছে নলি বসানো হবে। প্রায় ১৫ দিন পর রস সংগ্রহের জন্য গাছে গাছে ছোট-বড় মাটির হাঁড়ি বাঁধা হবে।”
একইভাবে জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের গাছি শামসুল ইসলাম বলেন, “সপ্তাহখানেক ধরে গাছ প্রস্তুতের কাজ করছেন তারা। ধারালো দা দিয়ে গাছের চাঁচ দেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিন পর নলি ও মাটির হাঁড়ি বসানো হবে। এরপর শুরু হবে খেজুরের রস সংগ্রহ।”
স্থানীয় মানুষের রসনা তৃপ্তির পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গার খেজুরের রস ও গুড় গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। জেলার অসংখ্য পরিবারের জীবনজীবিকা এই রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির ওপর নির্ভরশীল। শীতকালীন এই মৌসুমে গাছিদের কাছ থেকে কাঁচা রস কিনে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করা হয়। এছাড়া এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী গুড় ও পাটালি, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গায় বর্তমানে মোট ২ লাখ ৮৯ হাজার ১০০টি খেজুরগাছ রয়েছে। পুরো মৌসুমে এই গাছগুলো থেকে প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ লিটার রস উৎপাদিত হয়। তবে উৎপাদিত রসের মাত্র ১ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় পান করা হয় এবং বাকি ৯৯ শতাংশ রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়।
চলতি মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের আশা, এই মৌসুমে প্রায় ১ কোটি টাকার কাঁচা রস এবং আরও ১ কোটি টাকার খেজুরের গুড় বিক্রি হতে পারে। গুড়ের গুণগত মান বজায় রাখা এবং ভেজাল রোধ করার লক্ষ্যে গাছিদের বিশুদ্ধ ও মানসম্মত গুড় উৎপাদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরুল ইসলাম বলেন, “জেলার গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যে খেজুরগাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে আরও বেশি করে খেজুরগাছ রোপণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে গাছিদের ব্যস্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে। খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই চুয়াডাঙ্গার গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস জ্বাল দেওয়ার মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়বে। রস ও গুড় কেন্দ্রিক এই মৌসুমি বেচাকেনায় প্রাণ ফিরে পাবে গ্রামীণ অর্থনীতির এক পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ।