কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার বেগুনের বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারে সবজির দামও বেশ সন্তোষজনক। ফলন ও দাম—উভয় দিক বিবেচনা করে আশাবাদী হয়েছিলেন স্থানীয় কৃষকেরা। তবে সেই আশার আলো এখন ম্লান হয়ে যাচ্ছে ভাইরাসের ভয়াবহ আক্রমণে।

ভাইরাসের প্রভাবে আক্রান্ত গাছের পাতাগুলো হলুদ হয়ে যাচ্ছে এবং বেগুনের স্বাভাবিক আকৃতি নষ্ট হয়ে ফলগুলো কুঁকড়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাজারজাত করার উপযোগী বেগুনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক প্রয়োগ করে চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত কোনো ফল পাচ্ছেন না তারা।

কৃষকদের অভিযোগ, ক্ষেত আক্রান্ত হওয়ার পর রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রতিকারের সঠিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কোন ওষুধ ব্যবহার করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, তা নিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদ-নদীবেষ্টিত কুড়িগ্রামের বিভিন্ন চরাঞ্চলে বেগুনের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়। অনুকূল আবহাওয়া এবং ভালো ফলনের কারণে মৌসুমের শুরু থেকেই আশাবাদী ছিলেন তারা। বাজারে ভালো দাম থাকায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভের স্বপ্ন দেখছিলেন চাষিরা। তবে গাছে ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় সেই স্বপ্নে এখন ভাটা পড়েছে।

সরেজমিনে ক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও গাছে ঝুলছে পরিপক্ব বেগুন, আবার কোথাও এসেছে নতুন ফল। কিন্তু এর মধ্যেই অনেক গাছের পাতা হলুদ হয়ে গেছে। আক্রান্ত গাছের বেগুনের স্বাভাবিক আকৃতি বজায় থাকছে না; অনেক বেগুন কুঁকড়ে যাচ্ছে। এতে বেগুনের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিক্রিযোগ্য ফলের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

কৃষকেরা জানান, গাছে রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর থেকেই তারা বিভিন্ন ওষুধ স্প্রে করছেন। কিন্তু গাছ প্রকৃতপক্ষে কোন রোগে আক্রান্ত এবং তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ফলন ও আয় নিয়ে তৈরি হচ্ছে গভীর অনিশ্চয়তা।

তাদের মতে, বেগুন চাষে জমি প্রস্তুত করা, চারা রোপণ, সার, সেচ, পরিচর্যা ও বালাইনাশক প্রয়োগে ইতিমধ্যে অনেক টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এখন যদি গাছের রোগ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া কঠিন হবে। বিশেষ করে যেসব কৃষক ভালো ফলন ও বাজারদরের ওপর ভরসা করে বেশি জমিতে বেগুনের আবাদ করেছেন, তাদের দুশ্চিন্তা এখন সবচেয়ে বেশি।

কৃষকদের অভিযোগ, এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আক্রান্ত ক্ষেত পরিদর্শন করে রোগ শনাক্ত করা কিংবা প্রতিকারের উপায় জানাতে তাদের কাঙ্ক্ষিত তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা নিজেদের মতো করে ওষুধ প্রয়োগ করলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বেগুনের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে আগাম বেগুন চাষ করা হয়েছে। জেলার কৃষকদের জন্য বেগুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী সবজি ফসল। ফলন ভালো হলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে এ থেকে উল্লেখযোগ্য আয়ের সুযোগ রয়েছে।

তবে ভাইরাসের আক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে উৎপাদন ও বিপণন—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা। এ অবস্থায় আক্রান্ত ক্ষেতের রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা সম্পর্কে কৃষকদের দ্রুত পরামর্শ দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সদরের শুলকুর বাজার এলাকার বেগুনচাষী আব্দুল আউয়াল বলেন, “আমি ২২ শতক জমিতে বেগুন চাষ করেছি। এতে খরচ হয়েছে ২২ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে ১০ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করেছি। কিন্তু হঠাৎ গাছের পাতা হলুদ হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। এসব গাছের বেগুনও কুঁকড়ে যাচ্ছে।”

একই এলাকার কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমার জমিতেও ভাইরাস আক্রমণ করেছে। শুধু আমার নয়, প্রায় সবার বেগুনক্ষেতেই একই অবস্থা। কিন্তু এমন সংকটের মধ্যেও কৃষি বিভাগের লোকজনকে পাশে পাচ্ছি না।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরিন বলেন, “বেগুনগাছে হলুদ মোজাইক ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত গাছ শনাক্ত করা এবং রোগের বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আক্রান্ত গাছের ডালপালা কেটে ফেলতে হবে, বেশি আক্রান্ত হলে পুরো গাছ উপড়ে ফেলতে হবে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে আমাদের কর্মীরা রয়েছেন, তাঁরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।”