কুড়িগ্রাম জেলার আমন ধানখেতে মারাত্মক ছাতরা পোকার (মিলিবাগ) আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এই ক্ষতিকর পোকা ধানগাছের রস শুষে নেওয়ার ফলে গাছগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকেরা একাধিকবার বালাইনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করলেও কোনো কার্যকর ফল পাননি। ফলে চলতি আমন মৌসুমে ফলন বিপর্যয়ের প্রবল আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক।
আক্রান্ত এলাকার কৃষকদের দাবি, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে আমন ধানে এই ধরনের পোকার আক্রমণ তেমন দেখা যায়নি। তবে চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের জমিতে এই পোকার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃষকদের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকার ধানখেত পরিদর্শনে দেখা যায়, আক্রান্ত ধানগাছের কাণ্ড এবং পাতার খোলে সাদা তুলা বা মোমের মতো একটি আবরণ তৈরি হয়েছে। এই আবরণের নিচেই অবস্থান করছে ছোট ছোট পোকাগুলো। পোকার আক্রমণে গাছের পাতা হলদে হয়ে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ধানগাছগুলো একেবারে শুকিয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে।
উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের খাওনারদরগা এলাকার কৃষক আকবর আলী তার দুর্দশার কথা জানাতে বলেন, ‘এ মৌসুমে এক একর ৭৫ শতাংশ জমিতে আমন ধান লাগাইছি। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে ছাতরা পোকা আক্রমণ করেছে। এবার তো পুরো লস হলো।’
একই পরিস্থিতি রাজারহাটের কৃষক জগদীশ চন্দ্র সরকারের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। তিনি জানান, তার প্রায় ২৫ শতাংশ জমির ধান এই পোকার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করার চেষ্টা করলেও কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে তিনি আক্রান্ত ধানগাছগুলো কেটে গরুকে খাইয়ে দিয়েছেন।
স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতা কাইয়ুম সরকার জানান, তিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কীটনাশকের ব্যবসা করছেন। কিন্তু আমন ধানের খেতে এই ধরনের পোকার আক্রমণ আগে কখনো দেখেননি। গত বছর দু-একটি গাছে পোকা দেখা গেলেও তা তেমন ক্ষতি করেনি, তবে এবার বিভিন্ন জমিতে এর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ছাতরা পোকা কোনো রোগ নয়; এটি গাছের রস শোষণকারী ক্ষতিকর পোকা। এর আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পাতা হলদে হয়ে যায়। আক্রমণ তীব্র হলে গাছ শুকিয়েও যেতে পারে। তিনি আরও জানান, আগের বছরগুলোতে কুড়িগ্রামের আমন ধানের খেতে এ পোকার উপস্থিতি দেখা যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কুড়িগ্রামে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টর। এর বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে আবাদ করা হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ্ মো. রওশন কবির বলেন, খরার কারণে ধানখেতে ছাতরা পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে। এ পোকা দমনে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করে জানান, সঠিক সময়ে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী বালাইনাশক প্রয়োগ করলে এই পোকা দমন করা সম্ভব।