সুপারির মৌসুম শুরু হতেই লক্ষ্মীপুরের হাটবাজারগুলোতে ব্যাপক ব্যস্ততা দেখা দিয়েছে। রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে প্রচুর পরিমাণে পাকা সুপারি। ক্রেতারা এক স্তূপ থেকে অন্য স্তূপে ঘুরে গুণগত মান যাচাই করছেন এবং দরদাম করছেন। দামের বিষয়ে একমত হলে বস্তা বা ঝাঁকায় ভরে দ্রুত যানবাহনে তুলে দেওয়া হচ্ছে সুপারি। জেলার বিভিন্ন হাটবাজার থেকে সংগৃহীত এই সুপারি দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন এবং কেনাবেচার এই পুরো প্রক্রিয়ায় কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, লক্ষ্মীপুর জেলায় যদি সুপারিভিত্তিক শিল্প স্থাপন করা সম্ভব হয়, তবে কৃষকরা আরও বেশি দাম পাবেন এবং সঠিক মুনাফা অর্জন করতে পারবেন। এতে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তারা মনে করছেন।
জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল হলো সুপারি। বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমিতে সুপারি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া এবং সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাতের ফলে চলতি মৌসুমে সুপারির ফলন গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে, যা চাষিদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দের সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী এলাকার সুপারি বাজারে দেখা যায়, রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে প্রচুর সুপারি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রামের ছোট হাট থেকে সুপারি কিনে এনে এই বাজারে বিক্রি করেন। এই বাজারে আসা অধিকাংশ পাইকারই জেলার বাইরের। সপ্তাহে দুই দিন এখানে বেচাকেনা চলে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে শুধু এই বাজারেই এক থেকে দেড় কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়।
বাজারের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে প্রতি পণ (৮০টি) পাকা সুপারি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কাউন (১ হাজার ২৮০টি) সুপারি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা সুপারি কিনতে আসেন। তাদের মাধ্যমে এসব সুপারি বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।”
জেলার গুরুত্বপূর্ণ সুপারি বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে রায়পুর উপজেলার হায়দারগঞ্জ, আলিয়া মাদ্রাসা এলাকা, বাসাবাড়ি, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ। এছাড়া লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া ও জকসিন এবং রামগঞ্জের সোনাপুর, কাঞ্চনপুর ও করপাড়া বাজারেও সুপারির কেনাবেচা হয়। মৌসুমে বাগানমালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এসব বাজারে সুপারি নিয়ে আসেন, যা পরবর্তীতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন।
দুই যুগ ধরে সুপারির ব্যবসায় নিয়োজিত রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান বলেন, “সুপারির মৌসুমে কেনাবেচা বেড়ে যাওয়ায় তাদের ব্যস্ততাও বাড়ে। স্থানীয় হাটবাজার থেকে সুপারি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হয়।” তিনি আরও দাবি করেন যে, প্রতিবছর তার মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়।
লক্ষ্মীপুরে সুপারি সাধারণত তিনভাবে বিক্রি হয়: পাকা, ভেজানো এবং শুকনা। উৎপাদিত সুপারির একটি বড় অংশ ব্যবসায়ীরা পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করেন। নদী-নালা, খাল-ডোবা, পুকুর এবং সিমেন্ট-ইটের তৈরি পাকা চৌবাচ্চায় এই সুপারি রাখা হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয় এবং বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় অথবা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়।
রায়পুরের সোনাপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল মিয়া জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বাগানের সুপারি পাকে। এই সময়ে ভেজানো সুপারির মজুতদারেরা বাজার থেকে সুপারি কেনেন এবং তার বড় অংশ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। কৃষকদের বিক্রি শেষ হয়ে গেলে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে বাজারে সুপারির দাম বাড়তে থাকে, তখন ভেজানো সুপারির চাহিদা ও বিক্রি বৃদ্ধি পায়।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হিসেবে রায়পুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সুপারি চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় চরম উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। উপজেলার উত্তর চরবংশী, উত্তর চর আবাবিল, চর মোহনা ইউনিয়ন, সোনাপুর, রাখালিয়া এলাকা এবং লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিনিয়ত চুরির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে চোরের দল বাগানে প্রবেশ করে টাঙ্গা (ঝাঁকা) ভর্তি করে সুপারি নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি টাঙ্গা সুপারি মৌসুমে প্রায় আড়াইশ টাকা করে বিক্রি হয়। অথচ থানায় গিয়ে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যাতায়াত ও পরিবহন খরচ আরও বেশি হয়ে যায়। এই কারণে অনেকেই থানায় যেতে নিরুৎসাহিত হয়ে ক্ষতি মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, সুপারি এখন গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অবলম্বন। কিন্তু চুরি বন্ধ না হলে তারা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন। কৃষকদের দাবি, রাতে পুলিশি টহল বৃদ্ধি, গ্রাম পুলিশকে সক্রিয় করা এবং চোরচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি আশা করছেন যাতে আর কেউ এই চক্রের শিকার না হয়।
হায়দারগঞ্জের পাইকারি সুপারি ব্যবসায়ী মিজান মিয়া বলেন, “এখানকার সুপারি মানসম্মত ও সুস্বাদু। আমরা দেশের অনেক জেলায় পাঠাই। ফলন বেশি হয়েছে, তাই দামও একটু কম।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জহির আহমেদ বলেন, “জেলায় এ বছর ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারি আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার টন, উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার টন।” তিনি আরও বলেন, “এ মৌসুমে সুপারি থেকে ৭ শত কোটি টাকার বেশি আয় হবে বলে আশা করছি। জাত উন্নয়ন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন।”
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর লক্ষ্মীপুরে ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারি বাগান ছিল এবং বর্তমানে তা প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৪২ হাজার ২৭০ টন সুপারি এবং চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ টন।
লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সুপারির উৎপাদন ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে উন্নত জাত উদ্ভাবন, গবেষণা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা আরও উন্নত হলে লক্ষ্মীপুরের অর্থনীতিতে সুপারি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ আরও জানান, লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। একবার সুপারির চারা রোপণ করলে উপযুক্ত পরিবেশে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া সম্ভব। এই কারণে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হিসেবে সুপারি চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, “লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে। এরপরই রয়েছে সদর উপজেলা। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর পাকা, শুকনা ও ভেজানো সুপারি মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”