যশোরে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন সংসদ সদস্য। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে যশোর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে এসব অনিয়মের কথা জানান যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রছুল।

এই সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক গোলাম রছুলের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য আজিজুর রহমান, যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলী, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর এবং সহসেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুসসহ আরও অনেকে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন যে, প্রকৃত ব্যবসায়ী এবং কৃষির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ডিলারশিপ প্রদান করা হয়েছে। এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদেরও ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এই সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানিয়েছেন জামায়াতের পাঁচ সংসদ সদস্য।

জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রছুল জানান, যশোরের মোট ৯৩টি ইউনিয়ন এবং আটটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে চরম দলীয়করণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, যশোরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সুপারিশগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সরকারি দলের দেওয়া একটি তালিকা চূড়ান্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের সততা, পেশাদারিত্ব কিংবা দক্ষতার কোনো যথাযথ বিবেচনা করা হয়নি বলে দাবি করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয় যে, মাদক কারবারের অভিযোগে আটক এক ব্যক্তির স্ত্রী, একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী ও সমর্থক সার ডিলারশিপ পেয়েছেন। সংসদ সদস্যদের দাবি, এ ধরনের অযোগ্য নিয়োগ দেশের কৃষি খাত এবং সামগ্রিক জনস্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। সংসদ সদস্যরা জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের এসব কমিটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সামাজিক, কৃষক ও ব্যবসায়িক বিবেচনায় তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সাথে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। বরং উপজেলা ও জেলা বিএনপি থেকে সদস্য নেওয়া হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক গোলাম রছুল নির্দিষ্ট কিছু উদাহরণ দেন। তিনি দাবি করেন, বাঘারপাড়ার বাসুয়াড়ী ইউনিয়নের হাবিবুর ট্রেডার্সের হাবিবুর রহমানকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ব্যাংক ডাকাতি ও প্রতারণার মামলা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মণিরামপুর পৌরসভায় নাফিজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাসুদ পারভেজ রুবেলকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যিনি উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির ছেলে। এছাড়া মণিরামপুরের শ্যামকুড় ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সালাউদ্দীন এবং নেহালপুর ইউনিয়নে তবিবর রহমান ‘অনু’ নামে পরিচিত আওয়ামী লীগের এক কর্মীকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

অধ্যাপক গোলাম রছুলের দাবি, স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে এসব ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে দলীয় বিবেচনায় সার ডিলার নিয়োগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা। একই সঙ্গে তারা এই নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করার, অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করার এবং নিয়ম মেনে প্রকৃত, সৎ ও যোগ্য ব্যবসায়ীদের ডিলারশিপ দেওয়ার আহ্বান জানান।