ময়মনসিংহে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আত্মীয়স্বজনরা স্থান পেয়েছেন। বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্যের ভাই ও মামার নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সামনে এসেছে। এছাড়া ধান-চালের ব্যবসায়ী এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল ডিলারদেরও সারের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিরই বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতা।
এই অনিয়মের প্রতিবাদে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত কয়েক দিনে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এবং সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ গত ৯ অক্টোবর তাঁর ফেসবুক আইডিতে দেওয়া একটি পোস্টে এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার কিছু ইউনিয়নসহ বিভিন্ন উপজেলার কিছু ইউনিয়নে ফ্যাসিস্টের দোসরদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফ্যাসিস্টের দোসরদের নাম স্থানীয় প্রশাসন ১ নম্বর ক্রমিকে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আমি কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায়ে কথা বলে জেনেছি, স্থানীয় প্রশাসন যাদের নাম ১ নম্বর ক্রমিকে পাঠিয়েছে, মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে তাদেরই ডিলার নিয়োগ দিয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় তাদের নাম ১ নম্বরে গেল?’
সংসদ সদস্যের আত্মীয়স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ গতকাল সোমবার রাতে মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “সংসদ সদস্যের আত্মীয়স্বজন হলেই তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পাবেন না, এমন নয়। তাঁরা যোগ্য হলে এবং তাঁদের চেয়ে যোগ্য কেউ না থাকলে বিষয়টি ভিন্ন। যদি এর ব্যত্যয় হয় তাহলে সেটি অবশ্যই বিবেচনা করা হবে। তিন মাস পর তো পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘সারের ডিলার নিয়োগে যেখানে যেখানে অনিয়ম হয়েছে, সেখানে আমরা আহ্বান জানিয়েছি তদন্তপূর্বক পুনর্বিবেচনার জন্য। আমি শুনেছি সরকার সে ব্যাপারে তদন্ত করছে।’
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। যার বিপরীতে মোট ১ হাজার ৭৪৪টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ৯ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বর্তমানে নিয়োগপ্রাপ্তদের ডিলারশিপ অস্থায়ীভাবে দেওয়া হয়েছে এবং তিন মাস পর্যবেক্ষণের পর সন্তোষজনক হলে তা স্থায়ী করা হবে।
তালিকা প্রকাশের পরপরই বিভিন্ন এলাকায় অসন্তোষ তৈরি হয়। ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ ৯ অক্টোবর তাঁর ফেসবুক পোস্টে প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আনেন। তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন, ‘কে কোথা থেকে কত পারসেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।’
তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা যখন মামলা-হামলার শিকার হবেন, তখন অর্থের বিনিময়ে সার ডিলারশিপ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের ভাই ও মামা সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তালিকা অনুযায়ী, গফরগাঁওয়ের লংগাইর ইউনিয়নে মো. মনিরুজ্জামান ‘মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি সংসদ সদস্যের ছোট ভাই এবং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক।
এছাড়া উস্থি ইউনিয়নে সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান ‘জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিলারশিপ পেয়েছেন। পাশাপাশি যশরা ইউনিয়নে ‘সেলিম ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল রানা ডিলারশিপ পেয়েছেন, যিনি গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংসদ সদস্যের চাচাতো শ্যালক হিসেবে পরিচিত এবং বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করেন।
নিজের আত্মীয়দের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গোডাউন করার সক্ষমতা যাচাই করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার কোনো চাচাতো শ্যালক নেই। ভাই ও মামা তাঁদের যোগ্যতায় পেয়েছেন। সবচেয়ে নির্যাতিত লোকদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তারা সুবিধাবাদী।”
হালুয়াঘাট উপজেলার শাকুয়াই বাজারে ‘মেসার্স সালমান ইসলামীয়া স্টোর’-কে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হোসাইন আহম্মদ সালমান আগে খুচরা সার ডিলার ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। হোসাইন আহম্মদ সালমান দাবি করেন, যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি নিয়োগ পেয়েছেন এবং নতুন ডিলারশিপ পাওয়ার আগে খুচরা ডিলারশিপ প্রত্যাহার করে টাকা তুলে নিয়েছেন।
তবে হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান মুক্তকণ্ঠ কে জানান, ওই খুচরা ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল হয়নি এবং তাঁর কাছে প্রত্যাহারের কোনো আবেদনও জমা পড়েনি। খুচরা ডিলার থাকা অবস্থায় কীভাবে নতুন ডিলারশিপ পাওয়া গেল, তা জেলা কর্তৃপক্ষ জানাতে পারবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফুলপুরের ভাইটকান্দি ইউনিয়নে ‘মেসার্স সাদিকা ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত হোসেন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি ধান-চালের ব্যবসায়ী এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলার। ভাইটকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকৃত সার ব্যবসায়ী না হয়েও কীভাবে সাখাওয়াত হোসেন এই নিয়োগ পেলেন। তবে সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছেন, তিনি নীতিমালা মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন।
নিয়োগ না পাওয়া আবেদনকারী এবং বিএনপি নেতারা হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও ফুলপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক সংবাদ সম্মেলন করে ডিলার নিয়োগে ‘অলিখিত বাণিজ্য’র অভিযোগ তুলেছেন।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানান, নীতিমালার বাইরে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংসদ সদস্যের স্বজনদের বিষয়ে তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “কে কার আত্মীয়, সেটি বিবেচ্য নয়; নীতিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। গড়ে প্রতিটি ইউনিয়নে ১২ থেকে ১৩ জন ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু জেলা কমিটির সুপারিশ করার সুযোগ ছিল একজনের জন্য। এ কারণে অন্য আবেদনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। নীতিমালা অনুসরণ করেই ডিলার নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।”