রংপুরের পীরগাছায় সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় উপজেলা বিএনপির সভাপতির স্বাক্ষরিত একটি তালিকা ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় প্যাডে তৈরি এই তালিকায় নিজের আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) উপজেলা বিএনপি সভাপতির স্বাক্ষরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে জমা দেওয়া ওই দলীয় প্যাডের তালিকাটি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। নথিতে দেখা যায়, উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের জন্য মোট ১৯ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকায় বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ তাদের স্ত্রী, অনার্স পড়ুয়া মেয়ে, ছেলে, শ্বশুর এবং ফুফাতো ভাইয়ের নাম রয়েছে। শুধু বিএনপি নয়, তালিকায় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের নামও যুক্ত করা হয়েছে বলে দেখা গেছে।
নথির বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, উপজেলা-পীরগাছা, জেলা-রংপুর' পদবিযুক্ত প্যাডে স্বাক্ষর করেছেন আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা। সেখানে তার পদবি হিসেবে 'সভাপতি, পীরগাছা উপজেলা বিএনপি, রংপুর' লেখা সিলমোহর এবং তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। 'ডিলার নিয়োগ-২০২৬' শীর্ষক এই তালিকায় পীরগাছা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের জন্য ১৯ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে তাম্বুলপুর ও পীরগাছা সদর ইউনিয়নে তিন জন করে মোট ছয় জন, কান্দি ইউনিয়নের জন্য একজন এবং কল্যাণী, পারুল, কৈকুড়ি, ছাওলা, ইটাকুমারী ও অন্নদানগর ইউনিয়নের জন্য দুজন করে মোট ১২ জনের নাম দেওয়া হয়েছে।
তালিকাটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, এক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির অনার্স পড়ুয়া মেয়ে, এক ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর, সিনিয়র সহসভাপতির ছেলে এবং সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দলীয় পদধারীদের মধ্যে রয়েছেন এক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, এক সাবেক সভাপতি, চারজন সাধারণ সম্পাদক, একজন সাংগঠনিক সম্পাদক, একজন সহ-কোষাধ্যক্ষ, দুজন বিএনপি সমর্থক এবং কৃষক দলের একজন নেতা।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন এক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির ছেলে, একজন আওয়ামী লীগ সভাপতি, একজন জামায়াত কর্মী এবং জাতীয় পার্টির দুজন নেতা।
আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত ওই তালিকার বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, তাম্বুলপুর ইউনিয়নের তিনজনের মধ্যে ১ নম্বরে রয়েছেন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল আমীনের মেয়ে মোছা: সুইটি বেগম, যিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। ২ নম্বরে রয়েছেন ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছগির আলীর ছেলে রহমত চরের আব্দুল জলিল এবং ৩ নম্বরে আছেন একই ওয়ার্ডের রহমতের চরের আব্দুল আউয়ালের ছেলে ও জামায়াত কর্মী জাহেদুল ইসলাম।
পীরগাছা সদর ইউনিয়নের তিনজনের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অনন্তরাম গ্রামের মোছা: সুলতানা ফেরদৌসি, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী। ২ নম্বরে রয়েছেন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক ইসাদ গ্রামের মরহুম আব্দুর রশিদের ছেলে ও জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ কর্মী আমির হোসেন। ৩ নম্বরে আছেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চণ্ডীপুর গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার ঘনিষ্ঠ সহচর নাজমুল হুদা। তিনি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান রেজার ভাই এবং ওলামা লীগের উপজেলা সভাপতি মোখলেছুর রহমান জিন্নুরেরও ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে।
কল্যাণী ইউনিয়নের দুইজনের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের স্ব-চাষ এলাকার মরহুম আরমান আলীর ছেলে ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিন এবং ২ নম্বরে আছেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক পশুয়া গ্রামের মো. অজি উল্ল্যাহর ছেলে ও ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তহিদুল ইসলাম।
কান্দি ইউনিয়ন থেকে যুক্ত করা হয়েছে একজনের নাম। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক কান্দি নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। উল্লেখ্য, তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভু্টটু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
পারুল ইউনিয়নের দুইজনের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক পারুল গ্রামের তাহারত উল্লাহর ছেলে ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার এবং ২ নম্বরে আছেন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিরাহীম গ্রামের মরহুম কাচু আহমেদের ছেলে ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রেজাউল ইসলাম।
কৈকুড়ি ইউনিয়নের দুইজনের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী রানী গ্রামের মীর তৌফিক হাসান, যিনি ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে। ২ নম্বরে আছেন ২ নম্বর ওয়ার্ডের রামচন্দ্রপাড়া গ্রামের কোফাজ উদ্দিনের ছেলে ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মুনছুর আলী সরকার।
ছাওলা ইউনিয়নের দুইজনের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আদম চাড়ালপাড়া গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে ও ইউনিয়ন বিএনপির সহকোষাধ্যক্ষ মো. জাকির হোসেন এবং ২ নম্বরে আছেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আদম টিংপাড়া গ্রামের সাবু মিয়ার ছেলে ও কৃষক দল কর্মী মিজানুর রহমান।
ইটাকুমারী ইউনিয়নের দুইজনের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশুয়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম মিয়ার ছেলে, কীটনাশক ব্যবসায়ী ও বিএনপি সমর্থক মো. মাহমুদুল হাসান। ২ নম্বরে আছেন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধুরাম গ্রামের মরহুম ময়েন উদ্দিনের ছেলে মো. আলিমুদ্দিন। তার ছোট জামাতা মাসুদ রানা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং আলিম উদ্দিন জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমানেরও ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে।
অন্নদানগর ইউনিয়নের দুইজনের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন জগজীবন এলাকার জয়িতা আক্তার জিনি, যিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের অনার্সের শিক্ষার্থী। ২ নম্বরে আছেন ৭ নম্বর ওয়ার্ড হরিচরণ পাড়ার মরহুম আব্দুস ছাত্তারের ছেলে মো. মাহাবুর রহমান, যিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ফুফাতো ভাই।
এই বিষয়ে পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা বলেন, “সার ডিলার নিয়োগের জন্য আমি কোনো তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা কৃষি অফিসে দিইনি।” প্রতিবেদকের কাছে তালিকা থাকার কথা জানালে তিনি বলেন, “না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিন জানান, “উপজেলা বিএনপির সভাপতির দেওয়া কোনো তালিকা আমি পাইনি। কমিটির মাধ্যমে নিয়ম মেনে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নামের তালিকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) অফিসে পাঠানো হয়েছে।”
একই বিষয়ে পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন জানান, “উপজেলা বিএনপির সভাপতির পক্ষ থেকে কোনো তালিকা দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এ ধরনের তালিকা দেওয়ার সুযোগও নেই।”
এদিকে, পীরগাছা উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে সারের ডিলার নিয়োগের নামে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ডিলারশিপের জন্য টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় রংপুর জেলা মিডিয়া সেল সদস্য ও কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ২৫ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে টাকা গ্রহণের অভিযোগকে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস।