রংপুরের পীরগাছায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার দলীয় প্যাডে স্বাক্ষরিত তালিকায় থাকা ব্যক্তিরাই ‘কৃষি সার ডিলার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে ডিলার মনোনয়নে কোটি টাকার বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত তালিকার বিবরণীতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসককে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি’ কর্তৃক সুপারিশকৃত গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রেরিত স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে এবং ‘সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি’ কর্তৃক অনুমোদিত আবেদনকারীদের অস্থায়ী ভিত্তিতে শর্ত প্রতিপালনসাপেক্ষে সার ডিলার নিয়োগের পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত সার ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তার। প্রকাশ হওয়া এই তালিকায় পীরগাছা উপজেলার ৯ জনের নাম ছাড়াও রংপুর সদর উপজেলার মনোনীত ৪ জন, কাউনিয়া উপজেলার ৬ জন, তারাগঞ্জ উপজেলার ৩ জন, বদরগঞ্জে ৯ জন, মিঠাপুকুরে ১৪ জন, পীরগঞ্জে ১৬ জন, গঙ্গাচড়ায় ৯ জন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনে ১ জন মনোনীত সার ডিলার ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।

কারা পেলেন ডিলারশিপ

কল্যাণী ইউনিয়নে সার ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছে জেলা কমিটির সুপারিশকৃত তালিকার ১ নম্বরে থাকা জিকরুল আমিনের ‘বেলী ফার্টিলাইজার’। জিকরুল আমিন কল্যাণী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের স্ব-চাষ এলাকার মরহুম আরমান আলীর ছেলে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি। উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত তালিকাতেও জিকরুল আমিনের নাম শীর্ষে ছিল।

পারুল ইউনিয়নেও উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার ১ নম্বরে থাকা মো. আব্দুল মতিন সরকারের ‘মেসার্স নুহা ট্রেডার্স’ সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। তিনি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক পারুল গ্রামের তাহারত উল্লাহর ছেলে। বর্তমানে তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন।

ইটাকুমারী ইউনিয়ন থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধুরাম গ্রামের মরহুম ময়েন উদ্দিনের ছেলে মো. আলিমুদ্দিনকে সার ডিলার মনোনীত করা হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মেহেজেবিন ট্রেডার্স’। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

অন্নদানগর ইউনিয়ন থেকে মনোনীত করা হয়েছে উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার শীর্ষে থাকা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জগজীবন এলাকার জয়িতা আক্তার জিনিকে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘জয়িতা সার বিতান’। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের (অনার্স) শিক্ষার্থী।

ছাওলা ইউনিয়নে সার ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছেন জাকির হোসেনের ‘মেসার্স আয়মান ট্রেডার্স’। তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আদম চাড়ালপাড়া গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে এবং ইউনিয়ন বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ। বিএনপি সভাপতির স্বাক্ষরিত প্যাডে এবং উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকায় তার নামও ১ নম্বরে ছিল।

তাম্বুলপুর ইউনিয়নে মনোনীতদের মধ্যে ১ নম্বরে রয়েছেন সুইটি বেগম। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হওয়া তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মেসার্স শামান্তা অ্যান্ড সিফা ট্রেডার্স’।

পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সার ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছে মোছা. সুলতানা ফেরদৌসীর প্রতিষ্ঠান ‘রিয়া এন্টারপ্রাইজ’। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী।

কৈকুড়ি ইউনিয়ন থেকেও ১ নম্বর ক্রমিকে থাকা ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী রানী গ্রামের মীর তৌফিক হাসানকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মীর তৌফিক ট্রেডার্স’।

কান্দি ইউনিয়ন থেকে ‘মেসার্স সান ট্রেডার্স’কে মনোনীত করা হয়েছে। এটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের প্রতিষ্ঠান। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক কান্দি নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর দলীয় প্যাডে উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামের তালিকাটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রংপুর জেলা প্রশাসক ও ‘জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি’র সভাপতি বরাবর সুপারিশকৃত একটি তালিকা জমা দেন।

পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত ওই তালিকাসহ বিভিন্ন নথিতে দেখা গেছে, পীরগাছা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ১৯ জনের তালিকায় বিএনপি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ তাদের স্ত্রী, অনার্স পড়ুয়া মেয়ে, ছেলে, শ্বশুর, ফুফাতো ভাই ছাড়াও আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের নাম ছিল।

ওই তালিকার ৯টি ইউনিয়নের ১৯ জনের মধ্যে তাম্বুলপুর ও পীরগাছা সদর ইউনিয়নে ৩ জন করে ৬ জন, কান্দি ইউনিয়নের ১ জন এবং কল্যাণী, পারুল, কৈকুড়ি, ছাওলা, ইটাকুমারী ও অন্নদানগর ইউনিয়নের ২ জন করে ১২ জন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা বিতর্ক এবং কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি উপজেলা ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কমিটি। পীরগাছার ৯টি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রথম দিকে ৯ জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রীর নাম ছিল।

ওই তালিকায় কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিন, পারুলে আব্দুল মতিন, ইটাকুমারীতে মাহমুদুল হাসান, অন্নদানগরে জয়িতা আক্তার জিনি, ছাওলায় জাকির হোসেন, তাম্বুলপুরে সুইটি, পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী, কৈকুড়িতে তৌফিক এবং কান্দিতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নাম ছিল।

একই সঙ্গে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড, পোস্ট ও কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়লেও প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং রাজনৈতিক চাপ ও সমঝোতায় প্রশাসনের নাকের ডগায় বিতর্কিত উপায়ে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার ৯ ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। কেবল এই সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলেই তা দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকায়।

এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের নামও উঠে এসেছে।

স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে। এই অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমান।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা সার ডিলার নিয়োগে টাকা নেওয়ার বিষয়টিকে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস।