কেউ বিএনপি নেতার ছেলে, কেউ ভাই, কেউ ভাতিজা, আবার কেউ স্ত্রী কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। আবার কেউ রয়েছেন প্রবাসে। মেহেরপুরে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে উঠেছে এমনই নানা প্রশ্ন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলার তিন উপজেলা ও দুই পৌরসভায় ২২ জনকে নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা।
তাদের অভিযোগ, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী কিংবা স্থানীয় নেতাদের স্বজন। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নিজেদের কোনো ভূমিকা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি। জেলা প্রশাসন বলছে, উপজেলা কমিটির পাঠানো তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ আদেশের চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও নিয়োগের স্বচ্ছতা, আবেদনকারীদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত সার ব্যবসায়ীদের অনেকেই বাদ পড়েছেন। বিপরীতে, রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্কের কারণে অনেকে ডিলারশিপ পেয়েছেন।
নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের ভাতিজা সাবিক হাসান। তার প্রতিষ্ঠানের নাম আরএস ট্রেডার্স। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হক কুতুবপুর ইউনিয়নে আনিকা ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন। মেহেরপুর পৌরসভায় নিয়োগ পেয়েছেন পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফের ছেলে তানভির আহমেদের প্রতিষ্ঠান তানভির ট্রেডার্স।
এ ছাড়া আমঝুপিতে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক লিটনের ইন্দো বাংলা এন্টারপ্রাইজ এবং বুড়িপোতায় বিএনপি নেতা ফজলুর ছেলে মোহাম্মদ মামুনের মামুন ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে। তবে মামুন দীর্ঘদিন ধরে কুয়েতপ্রবাসী। শ্যামপুরে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহিদুল ইসলামের ছেলে সাইদ হোসেন অন্তরের এআর এন্টারপ্রাইজও নিয়োগ পেয়েছে। বারাদিতে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক লিয়াকতের স্ত্রীর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের নামও তালিকায় রয়েছে। পিরোজপুরে নিয়োগ পেয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিয়ার রহমানের বিশ্বাস ট্রেডার্স।
মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুরে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা ইমরান আহমেদ প্রিন্সের বাবা ইয়াকুব আলীর ভাই ভাই অটো, মোনাখালীতে মেহেদী হাসানের কৃষক বন্ধু ট্রেডার্স, বাগোয়ানে রকিবুল ইসলামের নির্বামনি ট্রেডার্স এবং মহাজনপুরে আনোয়ার হোসেনের রানা ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে।
গাংনী পৌরসভায় নিয়োগ পেয়েছেন পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ইন্সারুল হক ইন্সুর স্ত্রী রুমা খাতুন। কাথুলি ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ভাইয়ের ছেলে স্বাধীন খানের স্বাধীন ট্রেডার্স তালিকায় রয়েছে। তেঁতুলবাড়িয়ায় নিয়োগ পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম। কাজীপুরে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহাবদ্দিনের জেআর কাউন্টার, মটমুড়া ইউনিয়নে বিএনপির সদস্যসচিব মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের এনআর এন্টারপ্রাইজ এবং রায়পুরে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদাল হোসেনের স্ত্রী শান্তিয়ারা খাতুনের হক ট্রেডার্স নিয়োগ পেয়েছে। ষোলটাকায় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলামের কামরুল ট্রেডার্স এবং সাহারবাটিতে বিএনপি নেতা নাঈম মোবাশ্বেরের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের অনুসারীরা নিয়োগে প্রাধান্য পেয়েছেন। বিএনপির অপর অংশের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুন ও আমজাদ হোসেনের অনুসারীরা তালিকায় স্থান পাননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতা কাজী মিজান মেনন ফেসবুকে লিখেছেন, “দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনে সক্রিয় থেকেও তিনি বিভিন্ন সাংগঠনিক ও ব্যবসায়িক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।” সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় প্রথমে থাকলেও পরে তাকে দ্বিতীয় অবস্থানে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন মেনন।
কাজী মিজান মেননের ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন লেখেন, “স্বার্থ ও টাকার কাছে ত্যাগের মূল্য নেই।” সার ডিলার নিয়োগকে তিনি নিন্দনীয় ঘটনা বলে মন্তব্য করেন।
ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামও নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। প্রিন্স মাহমুদ লালন নামের আরেকজন কুতুবপুরে ডিলার নিয়োগ ও স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি নাজমুল হক লিটন বলেন, “আমার ছোট ভাই দীর্ঘদিন ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করেন। অথচ তাকে নিয়োগ না দিয়ে সদ্য অবসরে যাওয়া শিক্ষক এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হককে কুতুবপুরে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
মেহেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী সদস্য আনোয়ারুল হক কালু বলেন, “গত মাস পর্যন্ত আমি জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ছিলাম। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ আগের কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা হয়েছে এবং সেখানে চেম্বারের কোনো সদস্যকে রাখা হয়নি।”
মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি বাবলু সূত্রধর বলেন, কমিটিতে তিনি একা সিদ্ধান্ত নেননি, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে জেলা কমিটি চাইলে তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করতে পারত।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান বলেন, “দলীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান, সে লক্ষ্যেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই নিয়োগ হয়েছে। সবাইকে একসঙ্গে সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়। যারা পাননি, তাদের কেউ কেউ এ নিয়ে কথা বলছেন।”
জেলা বিএনপির সভাপতি ও মেহেরপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক জাভেদ মাসুদ মিল্টন বলেন, সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি কৃষি অফিস ও জেলা প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। এ ক্ষেত্রে তাদের কোনো করণীয় ছিল না। দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তার কাছে আগে কেউ করেননি বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি শিল্পী রানী রায় বলেন, “উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে যে তালিকা পাঠিয়েছে, সেটিই জেলা থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জেলা কমিটি আলাদাভাবে যাচাই-বাছাই করেনি। তবে নিয়োগ নিয়ে কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজ উদ্দিন খান অভিযোগ করে বলেন, “সার ডিলার নিয়োগে শতভাগ দলীয়করণ হয়েছে এবং ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই, এমন ব্যক্তিদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির নেতারা সারের ডিলারশিপ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়োগ দিয়েছেন।”