দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা দিন দিন ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে এবং সেবার চেয়ে বাণিজ্য প্রাধান্য পাচ্ছে বলে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র অভিযোগ রয়েছে। এমন প্রতিকূল সময়েই কিছু চিকিৎসক মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে যাচ্ছেন। টাঙ্গাইলের কালিহাতীর কুষ্টিয়া গ্রামে এমনই এক অনন্য উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট দিনে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত দরিদ্র গ্রামীণ মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা লাভ করছেন। এই মানবিক সেবার কারিগর হলেন চিকিৎসক সমর চন্দ্র পণ্ডিত (এস সি পণ্ডিত)।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. পণ্ডিতের এই কার্যক্রমটি কেবল লোকদেখানো কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত মানবসেবা কার্যক্রম। গ্রামের সাধারণ মানুষকে এই সেবার কথা জানাতে ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধজুড়ে মাইকিং করা হয়। এছাড়া রোগীদের বসার জন্য উঠানে যথাযথ ব্যবস্থা রাখা এবং অপেক্ষমাণ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের চা-পানের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন করা হয়—পুরো আয়োজনটি সেবার সংজ্ঞাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক এ এফ মহিউদ্দিন খানের অনুপ্রেরণা এবং সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূলীয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে এই পথে চালিত করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ফসল আজ তিনি তাঁর নিজ গ্রামের সাধারণ মানুষের আত্মিক সেবায় নিয়োজিত করে পূর্ণতা দিয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। সরকারি চাকরির প্রবল ব্যস্ততার মাঝেও তিনি প্রতি মাসে দুই দিন নিজ গ্রামে এবং এক দিন সন্তোষে রোগী দেখে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের সরকারি চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চরম অপ্রতুলতা সর্বজনবিদিত। এর পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও ডিগ্রি অর্জনের পর চিকিৎসকদের একটি বড় অংশের মধ্যে শহরকেন্দ্রিক প্রাইভেট প্র্যাকটিস এবং বাণিজ্যিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। নিজ শিকড় বা গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার যে অভাব বর্তমানে প্রকট, সেখানে ডা. এস সি পণ্ডিত প্রমাণ করেছেন যে সদিচ্ছা থাকলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সামাজিক অঙ্গীকার রক্ষা করা সম্ভব। তাঁর সাবেক শিক্ষকদের ভাষায়—“সে শহরে থাকে, কিন্তু গ্রামের মানুষকে ভুলে যায়নি।”
চিকিৎসা পেশাকে কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে জনকল্যাণমূলক ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত জরুরি। যখন দেশের লাখ লাখ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ অর্থের অভাবে সঠিক চিকিৎসার সুযোগ পান না, তখন ডা. পণ্ডিতের মতো মানুষদের এই উদ্যোগ সমাজের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবিকে বদলে দেয়। ডা. পণ্ডিতের এই কাজ দেশের অন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা, যাতে তাঁরাও নিজ নিজ শিকড়ে বা অনগ্রসর অঞ্চলে মাসে অন্তত একদিন হলেও মানুষের সেবা করতে এগিয়ে আসেন। ডা. সমর চন্দ্র পণ্ডিতের এই মানবিক উদ্যোগের প্রতি গভীর সাধুবাদ জানানো প্রয়োজন।