রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, নেই কোনো আত্মীয়তার বন্ধন। তবুও ১৫৭টি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে তিনি হয়ে উঠেছেন তাদের সবচেয়ে আপনজন। কখনো বাবা, কখনো বড় ভাই, আবার কখনো অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

মাত্র ৩৮ বছর বয়সে এমন এক বিশাল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার আগনুকালি গ্রামের বাসিন্দা সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস। তিনি মূলত স্কুল শিক্ষক মাহবুবুল হোসেনের ছেলে। অর্থের অভাবে যেসব মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন বারবার ভেঙে গেছে, তাদের সামনে তিনি খুলে দিয়েছেন নতুন জীবনের দুয়ার। বেনারসি, গহনা থেকে শুরু করে বিয়ের মঞ্চ, আলোকসজ্জা এবং খাবারের যাবতীয় আয়োজন তিনি সম্পন্ন করেন সাধারণ মানুষের সহযোগিতায়। আর এই অনন্য সেবার কারণেই স্থানীয় মানুষের কাছে তার পরিচিতি এখন '১৫৭ মেয়ের বাবা' হিসেবে।

অসহায় কোনো পরিবারের মেয়ের বিয়ে অর্থের অভাবে আটকে গেছে—এমন খবর পেলেই সেখানে ছুটে যান মামুন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে তিনি সহযোগিতার আবেদন জানান। দেশ-বিদেশের বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সেই অর্থ তিনি সরাসরি প্রকৃত অসহায় পরিবারের হাতে পৌঁছে দেন।

তার এই মানবিক কার্যক্রম শুধু মুসলিম পরিবারের মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অসহায় পরিবার, বাক্প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়ে কিংবা সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশেও দাঁড়িয়েছেন তিনি। যমুনার দুর্গম চর থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত বাড়ি—মানুষের অসহায়ত্বের খবর পেলেই সেখানে পৌঁছে যায় মামুনের মানবিকতার হাত।

জেলার কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঘরি গ্রামের আতিয়া খাতুনের জীবন ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার এক গল্প। অর্থের অভাবে এর আগে দুইবার বিয়ে ঠিক হয়েও ভেঙে গিয়েছিল তার। বাবা অসুস্থ এবং কর্মক্ষম নন, আর মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাড় করা তাদের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। আতিয়ার এই অসহায়ত্বের কথা জানতে পারেন মামুন বিশ্বাস। তিনি ফেসবুকে সহযোগিতার আবেদন জানান এবং মানুষের ভালোবাসায় মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ টাকা সংগ্রহ হয়। সেই অর্থ দিয়ে গত ২৫ সেপ্টেম্বর আয়োজন করা হয় আতিয়ার বিয়ে। যে মেয়েটির বিয়ের কার্ড বারবার থেমে গিয়েছিল, সেদিন তার হাতেই উঠেছিল মেহেদি। চোখে ছিল জল, তবে সেই জল ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে পাওয়া আনন্দের।

বিয়ের পর আবেগপ্লুত হয়ে আতিয়া বলেন, “অর্থের অভাবে তার দুইবার বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। এবার মানুষের সহযোগিতা আর মামুন বিশ্বাসের উদ্যোগে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।”

আতিয়ার বিয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই একই উপজেলার জামতৈল গ্রামের সুচিত্রা রানী দাসের খবর আসে মামুনের কাছে। পরিবারের নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই, ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তারা। যেখানে তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে মেয়ের বিয়ের খরচ ছিল আকাশচুম্বী স্বপ্ন। অর্থের সংকটে সুচিত্রার বিয়েও তিনবার ভেঙে যায়।

বিষয়টি জানতে পেরে মামুন বিশ্বাস আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের কাছে সাহায্যের আহ্বান জানান। মাত্র পাঁচ দিনে সংগ্রহ হয় প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ১ অক্টোবর সেই অর্থে সুচিত্রা রানী দাসের সঙ্গে পলাশ কুমার ভৌমিকের বিয়ের আয়োজন করা হয়। শুধু বিয়ের আয়োজনই নয়, সুচিত্রার মায়ের হাতে নগদ ২১ হাজার টাকা তুলে দেন মামুন। সুচিত্রার মা কামনা রানী দাসের কাছে সেই দিনটি যেন ছিল দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে ভোরের আলো।

উল্লাপাড়ার বড়হর ইউনিয়নের ধুনচি গ্রামের নন্দিনীর গল্পটি আরও বেশি কষ্টের। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে দুই মেয়ের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। প্রতিবেশীদের দেওয়া পুরোনো পোশাক পরে বড় হয়েছেন দুই বোন। অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মা ও মেয়ে বাঁশ দিয়ে কুলা বানিয়ে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এর মধ্যে নন্দিনীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল একবার বা দুবার নয়, বরং ছয়বার। কিন্তু প্রতিবারই অর্থের সংকটে ভেঙে গেছে সেই সম্পর্ক। একসময় নন্দিনী হয়তো ধরে নিয়েছিলেন তার জীবনে আর বিয়ের সাজ আসবে না। কিন্তু মানুষের গল্প কখনো কখনো অন্যভাবেও লেখা হয়।

নন্দিনীর কথা জানতে পেরে পাশে দাঁড়ান মামুন বিশ্বাস। ফেসবুকের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার টাকা সহযোগিতা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন তিনি। যারা তার বিয়ের জন্য সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন তিনি।

মামুন বিশ্বাসের মানবিকতার গল্প শুধু ১৫৭টি বিয়েতে সীমাবদ্ধ নেই। অসহায় পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ, খাদ্য সহায়তা, গবাদিপশু দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং দোকান নির্মাণসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। নিজের গ্রামে গড়ে তুলেছেন পাখির অভয়াশ্রম। তার অধিকাংশ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা। ফেসবুকের বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও মানবিক মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা পৌঁছে দেন প্রকৃত অসহায়দের কাছে। অথচ এতসব কাজের পরও কৃতিত্ব নিজের নামে নিতে নারাজ মামুন।

মামুন বিশ্বাস বলেন, “১৫৭টি বিয়েসহ সব মানবিক এবং ভালো কাজের কৃতিত্ব ফেসবুক বন্ধুদের। আমি শুধু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মানবিক কাজে সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আগামীতে আরও ভালো ভালো কাজ করা হবে, ইনশাআল্লাহ।”

জাতীয় তাঁতী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুস ছামাদ খান বলেন, “ইচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে অসহায় ও অভিভাবকহীন সন্তানদের জন্য সুন্দরভাবে বিয়ের আয়োজন করা সম্ভব মামুন বিশ্বাস তা সমাজের সামনে দেখিয়ে দিয়েছেন। তার মানবিক কর্মকাণ্ড প্রশংসনীয়।”

স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদক ও ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল হামিদের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সিরাজগঞ্জের খুকনী গ্রামে এক চায়ের দোকানে ফেরদৌস নামের এক প্রতিবন্ধী শিশুকে অন্য শিশুদের নির্যাতনের শিকার হতে দেখেন মামুন বিশ্বাস। ঘটনাটি তার হৃদয় গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেদিন রাতেই তিনি ফেসবুকে প্রতিবন্ধী শিশুদের সহায়তার আবেদন জানিয়ে একটি পোস্ট করেন। এভাবেই শুরু হয় তার মানবসেবার পথচলা। শুরুতে অনেকে তাকে উপহাস করলেও স্কুলশিক্ষক বাবা মাহবুবুল হোসেনের অনুপ্রেরণা ও সমর্থনে তিনি সব বাধা পেরিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ চালিয়ে যান।

তিনি আরও বলেন, মামুন বিশ্বাসের মূল লক্ষ্য হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের জীবনে আশার আলো জ্বালানো। মামুনের মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখুক এবং সমাজ হয়ে উঠুক আরও মানবিক ও সহমর্মিতাপূর্ণ।

যমুনার দুর্গম চর থেকে শহরের অলিগলি—কোথাও কোনো অসহায় মানুষের মুখে হতাশা দেখলে থেমে থাকতে চান না মামুন বিশ্বাস। তার কাছে ১৫৭টি বিয়ে শুধু ১৫৭টি অনুষ্ঠান নয়। প্রতিটি বিয়ের পেছনে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস, মেয়ের অপেক্ষা, মায়ের দুশ্চিন্তা আর একটি নতুন সংসারের স্বপ্ন। ৩৮ বছর বয়সেই তাই তিনি হয়ে উঠেছেন ১৫৭ মেয়ের বাবা। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও যে মানুষ ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন, অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়াতে পারেন, মামুন বিশ্বাসের গল্প যেন তারই প্রমাণ।