বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ঝালকাঠিতে এক বিশেষ বিনামূল্যে চক্ষু সেবা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। সাজেদা ফাউন্ডেশন ও ভিশনস্প্রিংয়ের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায় এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঝালকাঠি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী এই ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ক্যাম্পে মোট ৭৮৭ জনের চোখ পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার পর ৪৯১ জনের প্রেসবায়োপিয়া শনাক্ত হয় এবং তাদের বিনামূল্যে চশমা প্রদান করা হয়। এছাড়া ৩৬ জন ছানি রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।
সাজেদা ফাউন্ডেশন, ভিশনস্প্রিং, ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন, গ্রামীণ জিসি চক্ষু হাসপাতাল এবং উই ক্যান চেঞ্জের (ডব্লিউসিসি) সমন্বিত উদ্যোগে এই ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, এই বিশেষ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা, চশমা বিতরণ এবং ছানি অস্ত্রোপচারের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। ২০২৩ সাল থেকে সাজেদা ফাউন্ডেশন ও ভিশনস্প্রিংয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘রিডিং গ্লাসেস ফর ইমপ্রুভড লাইভলিহুডস’ কর্মসূচিরই একটি অংশ হিসেবে এই চক্ষু ক্যাম্পটি আয়োজন করা হয়েছে।
আয়োজকদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৫ বছরের বেশি বয়সি প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ছয়জন প্রেসবায়োপিয়ায় আক্রান্ত। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই সমস্যার প্রকোপ বেশি দেখা যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৬০ দশমিক ২ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৩ থেকে ১৩ শতাংশ মানুষ চশমা ব্যবহার করেন।
তৃণমূল পর্যায়ে সাশ্রয়ী ও টেকসই চক্ষু সেবা পৌঁছে দেওয়াই এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে শ্রমিক, কারিগর, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাজের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনমান উন্নয়নের কথা জানিয়েছেন আয়োজকেরা। তাদের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চশমা ব্যবহারের ফলে একজন ব্যক্তির আয় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, “একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশের জন্য আমাদের অবশ্যই চক্ষু সেবাকে প্রাধান্য দিতে হবে। ভালো দৃষ্টিশক্তি শিক্ষার্থীদের পড়ার ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। পাশাপাশি এটি আমাদের প্রবীণ প্রজন্মকে সমাজের সক্রিয় ও উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে বজায় রাখতে সহায়তা করে।”
সাজেদা ফাউন্ডেশনের এই মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, “মানুষের দোরগোড়ায় চক্ষু সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ জানাই।”
সাজেদা ফাউন্ডেশনের উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক বলেন, “বাংলাদেশে ১৪ লাখ মানুষের ছানি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। এ তথ্য থেকেই সহজলভ্য চক্ষু সেবার গুরুত্ব বোঝা যায়। সাজেদা ফাউন্ডেশন এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিনা মূল্যে চোখ পরীক্ষা, প্রেসবায়োপিয়ার চিকিৎসা ও চশমা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানুষ স্পষ্ট দেখতে পারবেন, জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং জীবিকার ভালো সুযোগ তৈরি হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার (পিএইচসি) অন্তর্ভুক্ত করে চক্ষু সেবার পরিধি আরও বাড়ানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মমিন উদ্দিনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই ক্যাম্পে ১০২ জন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীকে শনাক্ত করা হয়। এছাড়া ৭৯ জন সাধারণ রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। এছাড়া ঝালকাঠির পুলিশ সুপার মেরিন সুলতানা, জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. শাহাদাত হোসেন, সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর এবং ঝালকাঠি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
সাজেদা ফাউন্ডেশন একটি বেসরকারি অলাভজনক সংস্থা। সবার জন্য সুস্বাস্থ্য, আনন্দময় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে। সমন্বিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র অর্থায়ন এবং আর্থসামাজিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে টেকসই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কাজ করছে সংস্থাটি।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৪০০টির বেশি ইউনিট অফিস এবং ৬ হাজারের বেশি পূর্ণকালীন কর্মী নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সাজেদা ফাউন্ডেশন। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৮ লাখ মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।