নিজের জন্মভূমির মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং বাবা-মায়ের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে দীর্ঘ নয় বছর ধরে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছেন বরিশাল ডায়াবেটিস হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট ডা. আলতাফ মাহমুদ। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগে শুধু চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধই দেওয়া হয় না, বরং দূরদূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীদের যাতায়াতের খরচ এবং দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়।

গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বরিশালের উজিরপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামে অবস্থিত ডা. আলতাফ মাহমুদ হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রাঙ্গণে একটি দিনব্যাপী মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। এই ক্যাম্পে প্রায় এক হাজার ৫০০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয় রোগীদের টোকেন প্রদানের মাধ্যমে। এরপর প্রতিটি রোগীর রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। পরবর্তীতে ডা. আলতাফ মাহমুদ নিজেই রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন। নির্ধারিত বুথ থেকে রোগীরা সেই ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ সংগ্রহ করেন।

এই বিশেষ চিকিৎসাসেবা নিতে কেবল উজিরপুর নয়, বরং বাবুগঞ্জ, গৌরনদীসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা থেকেও অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন। যারা অত্যন্ত দূর থেকে অসহায় অবস্থায় আসেন, তাদের যাতায়াতের ভাড়ার ব্যবস্থা করা হয় আয়োজকদের পক্ষ থেকে। পাশাপাশি রোগীদের জন্য দুপুরে শুকনো খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল।

চিকিৎসা নিতে আসা মুনিয়া জামান তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, “বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পেয়ে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। শহরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা খরচ হয়। অথচ বাড়ির কাছে চিকিৎসক দেখাতে পেরেছি, ওষুধও পেয়েছি। গরিব মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ অনেক ভালো।”

আগৈলঝাড়া উপজেলা থেকে আসা মো. আল আমিন জানান, প্রতিবছর মাইকিংয়ের মাধ্যমে এই আয়োজনের কথা জানানো হয়। তিনি বলেন, “সকালে এসে চিকিৎসা ও ওষুধ নিয়েছি। বাড়ি ফেরার ভাড়াও দিয়েছেন চিকিৎসক।”

স্থানীয় বাসিন্দা আবু বকর বলেন, “এ উদ্যোগের মাধ্যমে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামের অসচ্ছল মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলেও রোগীদের প্রতি চিকিৎসকের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই।”

অন্যদিকে কামাল হোসেনের মতে, গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ির কাছেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ওষুধ পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “প্রয়োজনে সপ্তাহের যেকোনো শুক্রবার এখানে এসে চিকিৎসা নেওয়া যাবে।”

নিজের এই উদ্যোগের কথা বর্ণনা করে ডা. আলতাফ মাহমুদ বলেন, “মা–বাবার স্মরণে নয় বছর ধরে তাহমিনা ওয়াজেদ চ্যারিটি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করছি। মানুষের কল্যাণ ও উপকারের জন্যই এ উদ্যোগ। পরোপকারে যে এতটা তৃপ্তি পাওয়া যায়, তা বলে শেষ করা যাবে না। যত দিন বেঁচে আছি, এ আয়োজন অব্যাহত রাখার আশা রাখি।”

আয়োজনের ব্যবস্থাপক ফিরোজ খান জানান, এই ক্যাম্পে ডায়াবেটিস পরীক্ষা, রক্তচাপ পরীক্ষা, রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হয়। এবারের ক্যাম্পের জন্য তিন হাজারের বেশি ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধের মজুদ রাখা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, বছরজুড়েই প্রতি শুক্রবার ডা. আলতাফ মাহমুদ রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তা করে থাকেন এবং নিবন্ধিত রোগীরা পরবর্তী শুক্রবারগুলোতেও এখানে চিকিৎসাসেবা পাবেন।