শুধুমাত্র জয়লাভ করলেই চলত না, সাথে মেলাতে হতো নির্দিষ্ট সমীকরণও। আফগানিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এই হিসাব-নিকাশ নিয়ে আলোচনা ছিল প্রচুর। আগে ব্যাটিং করলে কী করতে হবে আর পরে ব্যাটিং করলে কী কৌশল নিতে হবে, তা নিয়ে পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সবটাই বৃথা গেল।

সমীকরণ মিলিয়ে জয় তো দূর, শারজায় আফগানিস্তানের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। অত্যন্ত হতাশাজনক ব্যাটিং এবং তার পর মান্ধাতাভোল বোলিংয়ের কারণে ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়ে তুলতে পারেনি তারা। শুরু থেকেই একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখা আফগানিস্তান ১৬১ রানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে ফেলে ৮৭ বল ও ৭ উইকেট হাতে রেখেই।

টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশ ১৬০ রানেই অলআউট হয়ে যায়। ফাইনালে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আফগানদের ১১৯ রানের মধ্যে আটকে রাখতে হতো। কিন্তু ম্যাচের ২৭তম ওভারেই আফগানিস্তান ১১৯ রান করে ফেললে নিশ্চিত হয়ে যায় যে বাংলাদেশের আর ফাইনাল খেলার সুযোগ নেই। আগামী পরশু এই ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আফগানিস্তান এবং টুর্নামেন্টের শুরুতেই বাংলাদেশকে পরাজিত করা জিম্বাবুয়ে।

বাংলাদেশের জন্য দিনটি যে দুঃস্বপ্নের মতো হবে, তা টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামার পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ২৮ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে শুরুটা ছিল অত্যন্ত করুণ। তখন ৪১ রানের জয়ের হিসাব করার চেয়ে সম্মানজনক রান সংগ্রহ করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।

ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৬০ রান কোনোভাবেই ভালো সংগ্রহ হিসেবে গণ্য করা যায় না। তবে এমন ভয়াবহ শুরুর পর আরও কম রানে অলআউট হয়ে যায়নি, সেটিই হয়তো একমাত্র ইতিবাচক দিক। কিন্তু ব্যাটসম্যানরা যেভাবে অফ স্টাম্পের বাইরে খোঁচা মেরে কিংবা বল টেনে এনে বোল্ড হয়ে আউট হয়েছেন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

রান সংগ্রহ একশোর নিচে নেমে যায়নি মূলত ওপেনার সাইফ হাসান এবং লিটন দাসের বিকল্প হিসেবে দলে আসা পারভেজ হোসেনের কারণে। পঞ্চম উইকেটে এই জুটিটি ৯৩ রান যোগ করে। পারভেজ হোসেন ৯৬ বলে ৭০ রানের একটি চমৎকার ইনিংস খেলে দলের হাল ধরেছিলেন।

৩২তম ওভারে সাইফ হাসান আউট হলে ভেঙে যায় এই গুরুত্বপূর্ণ জুটি। নয়তো ইনিংসটি আরও সামনে এগোতে পারত। পুরো ইনিংস জুড়ে সাইফ হাসান পঞ্চাশের কম স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করেছেন। যখনই তিনি আক্রমণ করতে চেয়েছেন, তখনই আউট হয়েছেন। ৮২ বলে ২ চার ও ১ ছক্কায় ৪৮ রান করা সাইফ হাসান মোহাম্মদ নবীর বলে এগিয়ে এসে শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন।

সাইফের বিদায়ের পর পারভেজ হোসেন দলের রান দুইশ পার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু সাইফ ফেরার ঠিক পরের ওভারেই তিনি তার শেষ স্বীকৃত ব্যাটিং সঙ্গী মেহেদী হাসান মিরাজকে হারিয়ে ফেলেন। পুল শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে একবার বেঁচে গেলেও দুই বল পরেই পুনরায় একই ভুল করে ক্যাচ দিয়ে আউট হন মিরাজ।

পারভেজ হোসেনও বেশিদূর টিকতে পারেননি। ৪০তম ওভারে রশিদ খানের বলে এলবিডব্লু হয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। এরপর আর মাত্র দুই ওভারের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। প্রথম চার ব্যাটসম্যান ৭ ওভারের মধ্যেই প্যাভিলিয়নে ফিরে যাওয়ায় এতটুকু সময় খেলতে পারাটাও ছিল বিস্ময়কর।

এই সামান্য রান নিয়ে জেতা যেমন কঠিন ছিল, তেমনি ৪১ রানে জিতে সমীকরণ মেলানো ছিল প্রায় অসম্ভব—যা শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। রহমানউল্লাহ গুরবাজ এবং সেদিকউল্লাহ আতালকে পাওয়ার প্লে-র মধ্যেই ফিরিয়ে এনে তাসকিন আহমেদ কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছিলেন। তবে রহমত শাহর ফিফটির পর সেই আশা ক্রমশ মিলিয়ে যায়।

আফগানিস্তান ৩৬তম ওভারেই রান তাড়া করে জয় নিশ্চিত করে। চরম হতাশা নিয়েই আরব আমিরাতের এই ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে বিদায় নিতে হলো বাংলাদেশকে। অথচ জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের মতো কাছাকাছি শক্তির দলের বিপক্ষে এই সিরিজে বড় প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ।

চ্যাম্পিয়ন হওয়া তো দূরে থাক, শেষ পর্যন্ত তারা ফাইনালেও জায়গা করে নিতে পারল না। পাশাপাশি টানা দুই ম্যাচে দুইশ রান করতে না পারা ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই সমস্যার উত্তর খোঁজার জন্য খুব বেশি সময় নেই, কারণ আগামী বছর অক্টোবরেই দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া ও জিম্বাবুয়েতে বিশ্বকাপে খেলতে নামতে হবে তাদের।