ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর সৌদি আরবে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়ার বাজারে এক অভাবনীয় মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। এই অস্থির পরিস্থিতির কারণে দেশটির রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।

এমন এক সংকটে সৌদি আরব ত্যাগ করতে ইচ্ছুক ধনী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া নেওয়ার হিড়িক পড়েছে। উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভাড়ার হার ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে বিমার (ওয়ার রিস্ক ইনস্যুরেন্স) প্রিমিয়াম খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি মাসের হামলার পর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবে তাদের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ পরিচালনা কার্যক্রম স্থগিত করায় ভাড়ার এই ঊর্ধ্বগতি আরও তীব্র হয়েছে।

ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান লাক্স জেটসের আলেকজান্ডার গ্রাহাম জানান, গত সপ্তাহে রিয়াদের উত্তরে অবস্থিত আল-কাসিম বিমানবন্দর থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাগামী একটি ফ্লাইটের ভাড়া ছিল ৯৪ হাজার ইউরো। বোম্বার্ডিয়ার গ্লোবাল ‘৬০০০’ মডেলের এই দূরপাল্লার উড়োজাহাজে সর্বোচ্চ ১৪ জন যাত্রী বসতে পারেন। অথচ রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ হওয়ার আগে একই গন্তব্যের ফ্লাইটের ভাড়া ছিল প্রায় ৬০ হাজার ইউরো।

গ্রাহাম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যাঁরা এখনো উড়োজাহাজ ভাড়া নিতে রাজি আছেন, তাঁদের কিছুটা বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে।’

হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ অক্টোবর থেকে রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত রোববার (১৮ অক্টোবর) বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এই বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য প্রদান করেনি। বিমান চলাচল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা, বিমানবন্দরটি চালু হলেও স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হতে বেশ সময় লাগবে।

উড়োজাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাব অনুযায়ী, হুতিদের হামলা শুরুর পর থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল এমন ৫ হাজার ৫০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। জার্মানির লুফথানসা এবং ইতালির আইটিএ সৌদি আরবে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও এয়ার ফ্রান্সের মতো সংস্থাগুলো আগেই তাদের ফ্লাইট পিছিয়ে দিয়েছিল।

ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ খাতের চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রিয়াদ ছাড়তে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এখন আল-কাসিম বিমানবন্দর থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া নিচ্ছেন। এই ছোট বিমানবন্দরটি রিয়াদ থেকে ২০০ মাইলের বেশি দূরে অবস্থিত। অন্যদিকে, যাঁদের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া করার সামর্থ্য নেই, তাঁরা প্রতিবেশী দেশ বাহরাইন বা কাতারে গিয়ে সেখান থেকে ফ্লাইটে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে সৌদি আরবে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন।

অনলাইন সেবা প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্যমতে, সৌদি আরবের স্থানীয় উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো আল-কাসিম থেকে দুবাই, কায়রো এবং বাহরাইনসহ বিভিন্ন গন্তব্যে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্ট চারজন ব্যক্তির দাবি, পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের রিয়াদে কর্মরত শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এজন্য তারা ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়ার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এসব কর্মকর্তাকে দুবাই অথবা নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধের সময় যেভাবে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, এবার তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ওই সময় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল, যা সৌদি আরবে এখন পর্যন্ত ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় সৌদি আরবে পশ্চিমা প্রবাসীদের সংখ্যা কম এবং ইউএই মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়ার অনলাইন বাজারব্যবস্থা এন্টারজেটসের প্রতিষ্ঠাতা চার্লস রবিনসন জানান, সৌদি আরব থেকে ইউরোপগামী ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ভাড়া দেড় লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটগুলোর ভাড়া পড়ছে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার।

রবিনসন বলেন, ‘সংঘাতের প্রভাব পড়েছে এমন বিমানবন্দরগুলোতে উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে গেছে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো এই বাজারে আছে, তারা বিষয়টি জানে। কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। কারণ, চাহিদা আছে, কিন্তু প্রতিযোগিতা নেই।’

তিনি আরও জানান, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহক প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো এলাকায় যেতে চাইছেন এবং সেখান থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। লাক্স জেটসের গ্রাহাম জানান, ইউরোপগামী যাত্রীদের জন্য উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খালি উড়োজাহাজও সৌদি আরবে পাঠাচ্ছে।

মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, ভাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের যুদ্ধঝুঁকি বিমার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়ার প্রতিষ্ঠান ভিক্টরের সহপ্রধান নির্বাহী টবি এডওয়ার্ডস বলেন, ‘যুদ্ধঝুঁকি বিমার প্রয়োজন হলে খরচ অনেক বেড়ে যায়।’ তিনি জানান, প্রায় ১৮ আসনের বড় উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে এবং ৮ থেকে ১০ আসনের ছোট উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে ৮ হাজার ডলার।

এন্টারজেটসের রবিনসন জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ফ্লাইটে যুদ্ধঝুঁকি বিমার কারণে মোট খরচ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সৌদি আরবে সরাসরি আসা-যাওয়ার ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচের হার আরও বেশি। তবে ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে বিমা খরচ যে পর্যায়ে উঠেছিল, এখনো তা সেখানে পৌঁছায়েনি। ওই সময় একটি যাত্রার বিমা সুরক্ষার জন্যই বিমা কোম্পানিগুলো ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত আদায় করছিল।

তা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে যাতায়াত এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের চাহিদা এখনো সন্তোষজনক। টবি এডওয়ার্ডস বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে তেমন কোনো প্রভাব পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের একজন নতুন গ্রাহক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এক সপ্তাহের ছুটি কাটাতে তুরস্কের আনাতালিয়া থেকে দুবাই গেছেন। আরেকজন নিয়মিত গ্রাহক গত শুক্রবার কুয়েতে গেছেন। এরপর গতকাল তিনি দুবাইয়েও গেছেন।’