দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর সক্ষমতা প্রদর্শন করে আসছে। দেশটির তেল খাতের অবকাঠামো থেকে শুরু করে রাজধানী রিয়াদ পর্যন্ত কোনো স্থানই তাদের লক্ষ্যবস্তুর বাইরে নেই।

তবে রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পর্যায়ক্রমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা সৌদি আরবের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। গত ৬ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় অন্তত ২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৪০০ জন। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবস্থিত জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়, যার ফলে সেখানে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কেঁপে ওঠে ইয়েমেনের রাজধানী।

মূল প্রশ্নটি হলো, হুতিদের সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো বারবার কীভাবে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করতে পারছে? আর দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলো সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সম্পর্কে এই ঘটনাগুলো কী বার্তা দিচ্ছে?

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সম্ভাব্য এই ধরনের হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থাগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমআইএম-১০৪ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এছাড়া সৌদি আরবের কাছে আরও উন্নত টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড ব্যবস্থাও রয়েছে।

এই দুটি ব্যবস্থাই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম এবং যুদ্ধক্ষেত্রেও তারা নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। এছাড়া সৌদি বিমানবাহিনীতে রয়েছে উন্নত এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ও ইউরোফাইটার টাইফুন, যা ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় সক্ষম। তা সত্ত্বেও হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বারবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাচ্ছে অথবা তা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। এর ফলে বিশাল ভূখণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে দেশটি।

‘পরিকল্পিতভাবে সংঘাত বাড়ানো’

প্রায় এক দশক ধরে দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে হুতিদের। ২০১৭ সালেও তারা রিয়াদকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। ইউরোপীয় নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্রের (সিইপিএ) প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফেদেরিকো বোরসারি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, “এরপর থেকে ইরানের সহায়তায় হুতিদের অস্ত্রভান্ডারে আরও উন্নত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হয়েছে। তবে নতুন কোনো সক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ নেই।”

তাঁর মতে, আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত লক্ষ্যবস্তুতে বারবার এবং সমন্বিতভাবে হামলা চালানোর সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। বোরসারি আরও বলেন, “হামলার সময় দেখে মনে হচ্ছে, ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরুর প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা বাড়ানো হচ্ছে।”

হুতিরা প্রমাণ করেছে যে, সৌদি রাজধানীর ওপর সরাসরি ক্ষয়ক্ষতি ও চাপ তৈরির সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা—দুটিই তাদের রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা বাড়াতে হুতিরা বহু বছর ধরে কাজ করছে। তিনি বলেন, “ইসরায়েলে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে হুতিরা তাদের দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা আরও উন্নত করেছে। যেসব হামলাকে ব্যর্থ বলে মনে হয়েছে, সেগুলো থেকেও তারা শিখেছে এবং নিজেদের কৌশল বদলেছে।”

আঞ্চলিক বিভিন্ন স্থানে হামলার অভিজ্ঞতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগিয়ে হুতিরা উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। আল-বাশা বলেন, সৌদি আরব প্যাট্রিয়ট, থাডসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু দেশটির বিশাল ভূখণ্ডের সর্বত্র কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি আরও বলেন, “সৌদি আরবের পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়া হুতিদের জন্য জরুরি নয়। একটি সফল হামলাই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে।”

বারবার হামলার ঘটনা আরেকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চলতে থাকলে তা মোকাবিলার জন্য সৌদি আরবের হাতে পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে কি না।

প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট

মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাহী পরিচালক এবং নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিকোলাস হেরাস বলেন, সৌদি আরবের বড় একটি অংশ মরুভূমি। বিশাল দূরত্বের কারণে এই ভূখণ্ডের প্রতিটি জায়গায় কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। এমন এলাকায় আগাম সতর্কতাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য কর্মী নিয়োগ ও তা সচল রাখতেও বেশি খরচ হয়।

তবে এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে যে, ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সময় সৌদি আরবের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে বিপুলসংখ্যক ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, ফলে মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। একই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বোরসারির মতে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে হামলা চালানোর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া। তবে একে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন। তিনি গত মাসের কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমে আসছে।

বোরসারি বলেন, “এসব খবর সত্য হলে আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন হামলা ঠেকানো হবে, কোন লক্ষ্যবস্তুর জন্য কতটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একসঙ্গে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।”

একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে হুতিরা। এর মধ্যে রয়েছে একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। অত্যাধুনিক ও বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও দীর্ঘ সময় ধরে চলা ব্যাপক হামলার ক্ষেত্রে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র বা উড়ে আসা অস্ত্র ধ্বংস করতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

বোরসারি বলেন, “রিয়াদে হামলার ঘটনা সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বারবার হামলার মুখে স্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্ন অস্বীকার করা হবে সরলীকরণ।”

ব্যয়বহুল পাল্টাপাল্টি কৌশল

বোরসারি বলেন, সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী, তা এখনো জানা যায়নি। একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের ওপর। তিনি বলেন, “শুধু প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র কতটা উন্নত, তার ওপর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে না। রাডার ও অন্যান্য সেন্সরের আওতা, বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দক্ষতা এবং পর্যাপ্ত গোলাবারুদের মজুতও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসবের যেকোনো একটির দুর্বলতা কিংবা একাধিক সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে হামলা ঠেকানো ব্যর্থ হতে পারে।”

সৌদি আরবের ভৌগোলিক অবস্থানও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সমুদ্রবন্দর ও সামরিক ঘাঁটি বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এসব স্থাপনায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যয়বহুল এবং কঠিন।

বোরসারি বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শত্রুর হামলা শনাক্ত করা। এ জন্য আগাম সতর্কতা নিশ্চিত করতে উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এমন নজরদারি বজায় রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একই সঙ্গে সরঞ্জাম ও জনবলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

বিশেষ করে ড্রোন মোকাবিলায় তুলনামূলক কম খরচের কিছু বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে আছে স্বয়ংক্রিয় অ্যান্টি-ড্রোন টারেট, যেখানে ভারী মেশিনগান ব্যবহার করা হয়। স্বল্পপাল্লার কম খরচের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। বোরসারি বলেন, আশঙ্কা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতেও সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ড্রোন প্রবেশের ঘটনা চলতে থাকবে।

ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান রেনের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের প্রধান এবং প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক ফ্রেডি খুয়েরির মতে, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে শুধু ভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে হামলাকারীরা নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়।

তিনি বলেন, “ইরান ও তাদের সহযোগীরা বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে কীভাবে অভিযান চালাতে হয়, তা শিখছে বলে মনে হচ্ছে। হামলার পথ ও কৌশল পরিবর্তন করে তারা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে হামলা ঠেকাতে প্রতিপক্ষের ব্যয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।”

খুয়েরির মতে, সৌদি আরবসহ পুরো অঞ্চলের জন্য শিক্ষা হলো—আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিস্তৃত নজরদারি, পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং পরিবর্তনশীল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলানো জরুরি।

পল ইডন ইরাকি কুর্দিস্তানের একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, রাজনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালিখি করেন। মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।