ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনায় অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। হামলাটি কেবল শনিবারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরদিন রোববার সেখানে দ্বিতীয় দফায় আক্রমণ চালানো হয়, যাতে আরও একজন নিহত এবং অন্তত ১১ জন আহত হন। এরপর গতকাল সোমবার দিবাগত রাতে তৃতীয়বারের মতো রিয়াদের আকাশসীমা কাঁপিয়ে হামলা চালিয়েছে হুতিরা।

সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত। দেখা গেছে, টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আতঙ্কিত যাত্রীরা জীবন বাঁচাতে মেঝেতে শুয়ে পড়ছেন। রাজধানীর ২২ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরটির টার্মিনাল ভবনটি হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক আক্রমণ চালাচ্ছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত এটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক আঘাত। আপাতদৃষ্টিতে এই সহিংসতা আরব উপদ্বীপের ভেতরে সীমাবদ্ধ মনে হলেও এর বৈশ্বিক ঝুঁকি অত্যন্ত গভীর। এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

হুতিদের এই আক্রমণ কৌশলী সুযোগসন্ধানী পরিকল্পনার পাশাপাশি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তপ্ত যুদ্ধ পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করলে হুতিরা শুরুতে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেছিল। তবে গত মাসে তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা দখল করে নেয়। তারা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নিয়ে ফেলে। উল্লেখ্য, এই নৌপথ দিয়েই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।

গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী এবং তাদের মিত্ররা হুতিদের ওই প্রণালি থেকে হটিয়ে দিতে বড় ধরনের পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করেছে। তারা হুতিদের বিভিন্ন ঘাঁটিতেও আঘাত হেনেছে। সৌদি আরব শুরু থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সব ধরনের সামরিক সমর্থন দিয়ে আসছে। আর এই সমর্থনের কারণেই রিয়াদ এখন সরাসরি হুতিদের নিশানায় পরিণত হয়েছে।

হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। এই স্থাপনাগুলো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক মর্যাদার প্রতীক। এই আঘাতের মাধ্যমে রিয়াদকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে মদদ দেওয়ার সামরিক খেসারত কতটা চড়া হতে পারে।

এই পরিস্থিতির মাধ্যমে তেহরান বড় ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে হুতিদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে আসছে। লোহিত সাগর ও সৌদি আরবে হুতিদের এই হামলা আবারও প্রমাণ করল যে, তেহরান ও তাদের মিত্ররা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর বিশাল প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা রাখে।

গত এক দশকের মধ্যে সৌদি আরবের মাটিতে এটি সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই হামলার কারণে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচলে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো রিয়াদের উদ্দেশে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রিয়াদের বাণিজ্যিক এলাকার শীর্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। নগর কর্তৃপক্ষ এই সপ্তাহে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদান বন্ধ রেখে অনলাইন ক্লাসের নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি রাজধানীতে নির্ধারিত একটি বড় জ্বালানি সম্মেলন থেকে বিশ্বের শীর্ষ তেল নির্বাহীদের নাম শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরব কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকলেও দেশটির নিজস্ব মাটিতে যুদ্ধের সহিংসতা খুব কমই আঘাত হেনেছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি নিজেকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে ফেলেছে। সৌদি শাসকেরা এত দিন যেকোনো মূল্যে এই পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে চেয়েছিলেন।

সামরিক খাতে সৌদি আরব বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং অস্ত্র আমদানির দিক থেকে দেশটি বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে। তা সত্ত্বেও হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করা রিয়াদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেছেন, “সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুতিদের কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে পেরেছে, সত্য। তবে সৌদি আরবের ভৌগোলিক আয়তন এতটাই বিশাল যে পুরো দেশের আকাশসীমা সব সময় সুরক্ষিত রাখা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব।”

অন্য সামরিক বিশ্লেষকেরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, ইসরায়েলের বিশ্বখ্যাত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও গত বছর তাদের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর আঘাত হানা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে ব্যর্থ হয়েছিল।

আগাম বিমান হামলা চালিয়ে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করাও সহজ কাজ নয়। ২০২৫ সালে মার্কিন বোমাবর্ষণ প্রমাণ করেছে যে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা কতটা জটিল। বিশেষ করে ইরানি প্রযুক্তি, পরামর্শ ও অর্থায়নে তারা নিজেদের অস্ত্রের ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে নিয়েছে।

হুতিরা দাবি করেছে, তাদের এই হামলা সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি পাল্টা জবাব। তারা ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এই হামলা চালাচ্ছে। তবে তারা হামলা থামানোর কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।

হুতিদের পরিচালিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সৌদি শত্রু যদি ইয়েমেনে নিজেদের আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ বন্ধ না করে, তাহলে সামনে তাদের জন্য আরও ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।”

সৌদি আরব পাল্টা বিমান হামলা বন্ধ করবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে হুতিদের ছোড়া প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে আটকে দেওয়ার মতো সক্ষমতাও রিয়াদের নেই। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈরিতা শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এই দুই দেশের সংঘাতই মূলত ইয়েমেনের সহিংসতা বাড়িয়ে তোলার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেছেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বছরের পর বছর ধরে হুতিদের সামরিক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করে এসেছে।” তিনি আরও মন্তব্য করেছেন, “হুতিরা সত্যি সত্যিই তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা অনেক বাড়িয়েছে।”

হুতিরা বিশ্বাস করে, এই লড়াই তাদের পুরো অঞ্চলে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। তারা এখন নিজেদের অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও ক্ষমাবান মনে করছে। তবে পরিস্থিতি তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে বলে যা ভাবছে, বাস্তবে তা মারাত্মক এক বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।