রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সাতজন ব্যবসায়ী। মৌসুমের শুরুতে বীজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য কিনে এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জাজিরার কাজীরহাট বাজার থেকে তাঁরা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেন। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পাঁচ ব্যবসায়ী। তাঁদের সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যবসায়ী গুরুতর আহত হয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার ভোর চারটার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে ব্যবসায়ীদের বহনকারী বাসের সঙ্গে একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত এবং অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

নিহত পাঁচ ব্যবসায়ীর পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন জাজিরার বড়কান্দি ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জুয়েল মাদবর (৪০), ডুবিসায়বর সালাল মোল্যা (৪৫), সোহাগ শিকদার (৩০), আব্দুস সামাদ ফকির (৭০) এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার শাহিন ব্যাপারী (২৫)। এছাড়া ওই বাসে থাকা কাজীরহাট বাজারের ব্যবসায়ী আলমগীর মাদবর ও ফয়সল হোসেন আহত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে।

পরিবার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজীরহাট বাজার ও এর আশপাশের এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। রবিশস্যের মৌসুম শুরু হওয়ায় ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও পণ্য সংগ্রহ করতে তাঁরা রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।

নিহতদের স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যায় সাত ব্যবসায়ী জাজিরার নাওডোবা থেকে বাসে করে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় যান। সেখান থেকে রাতে বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন তাঁরা। বাসটি যখন বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে পৌঁছায়, তখন বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচজন মারা যান।

নিহত ব্যবসায়ীদের পেশাগত পরিচয় জানা গেছে। জুয়েল মাদবর রবিশস্য কেনাবেচার পাশাপাশি কাজীরহাট বাজারে রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির ছিলেন একজন রবিশস্য ব্যবসায়ী। শাহিন ব্যাপারী হলুদ কেনাবেচার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সালাল মোল্যা ও সোহাগ শিকদার পেঁয়াজ ও রসুনের বীজের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন।

জুয়েল মাদবরের ভগ্নিপতি বাদল জমাদ্দার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জুয়েলের বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। তাঁরা তিন ভাই কাজীরহাট বাজারে ব্যবসা করেন। ভুট্টার বীজ ও ভুট্টা আনতে তিনি রাজশাহী যাচ্ছিলেন।”

তিনি আরও জানান, ছোট দুই সন্তান ও স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে গতকাল বিকেলে রাজশাহী যাওয়ার জন্য বের হন জুয়েল। আজ সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে পরিবার স্তব্ধ হয়ে গেছে। এভাবে দুর্ঘটনায় তাঁর প্রাণ যাবে, তা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি।

কাজীরহাট বণিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নিহত ব্যবসায়ীদের মরদেহ আনার জন্য আমরা নাটোরের পথে রওনা হয়েছি। আহত ব্যবসায়ীদের স্বজনেরা তাঁদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে রাজশাহীতে গেছেন।”

বড়কান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর খলিফা জানান, এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো নিয়ে আসতে আজ সন্ধ্যা বা রাত হতে পারে। এরপর ব্যবসায়ীদের মরদেহ কাজীরহাট বাজারে নেওয়া হবে। সেখানে একসঙ্গে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।”

এদিকে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান। তিনি নিহত ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।