নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে ফেরার স্বপ্ন নিয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন (৩০)। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর সত্যি হলো না। নাটোরের বনপাড়ায় এক ভয়াবহ বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এখন রাজশাহীর বাগমারায় তার বাড়ির পাশে খোঁড়া হচ্ছে কবর। যে মানুষটির প্রত্যাশায় দিন গুনছিলেন স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা, তিনি ফিরছেন নিথর দেহে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালটি ফাতেমা বিবির জন্য অন্য আটদশটা দিনের মতোই শুরু হওয়ার কথা ছিল। সন্তানদের নিয়ে সংসারের স্বাভাবিক কাজে ব্যস্ত হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু হঠাৎ করেই নেমে এলো এক দুঃসংবাদ, যা মুহূর্তেই তার সাজানো জীবনকে ওলটপালট করে দিল। স্বামীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবরটি শোনার পর থেকেই ভেঙে পড়েন ফাতেমা। প্রিয়জনকে হারানোর এই শোক তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না; বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। কান্নায় ভেঙে পড়ায় কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়েছিলেন তিনি। পাশে থাকা তার দুই সন্তান হয়তো এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছে না যে তারা কী হারিয়েছে। যে বাবা বাড়ি ফিরে তাদের কাছে আসার কথা ছিল, তাকে আর কখনো তারা দেখতে পাবে না।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের চাইপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে। তিনি ঢাকায় একটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি একটি নতুন প্রকল্পে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। সেই নতুন কর্মস্থলে যোগদান প্রক্রিয়া শেষ করে বাড়ি ফেরার পথেই ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

জীবনের এই পর্যায়ে নতুন চাকরিটি তার কাছে ছিল এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। পরিবারকে নিয়ে সুখী হওয়ার স্বপ্ন এবং সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশাই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ভোরের এক আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনা নিমেষেই থামিয়ে দিল তার সব পথচলা।

ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বরিশাল থেকে আসা আরপি পরিবহন-এর একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন আনোয়ার হোসেন।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, বাগমারার চাইপাড়া গ্রামে শুরু হয় পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা—প্রিয় মানুষটির মরদেহ কখন বাড়িতে পৌঁছাবে।

সকালে আনোয়ারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের ভিড়। কেউ স্বজনদের সাহস দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউবা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে তখনো কবর খননের কাজ চলছিল, যদিও আনোয়ারের মরদেহ তখনো বাড়িতে পৌঁছায়নি। পরিবারের সদস্যদের চোখে-মুখে শোকের পাশাপাশি প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখার এক আকুল অপেক্ষা ছিল।

সকালে মরদেহ সংগ্রহের জন্য নাটোরের উদ্দেশে রওনা হন আনোয়ারের চাচা আকতার হোসেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, “লাশ লিবার আলছি, এখনো পাইনি।” কথাগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও এর গভীরে লুকিয়ে ছিল স্বজন হারানোর তীব্র বেদনা। একদিকে প্রিয়জনের মরদেহ দ্রুত ফিরিয়ে আনার তাগিদ, অন্যদিকে বাড়িতে অপেক্ষমাণ শোকাতুর স্বজনদের আকুতি।

সকাল ১০টার দিকে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন ফাতেমা বিবি। যে বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাড়িতেই তাকে ফিরতে হলো স্বামীহারা হয়ে।

তার সামনে এখন এক কঠিন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জীবনসঙ্গী নেই, সন্তানদের মাথার ওপর থেকে সরে গেছে বাবার ছায়া। সামনে কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে বড় হবে সন্তান দুটি—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন অজানা। স্বামীর মৃত্যুর শোক সামলে ওঠার আগেই তাকে ভাবতে হচ্ছে সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। যে মানুষটির সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল, তিনি আর কোনোদিন ফিরবেন না—এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নেওয়াই এখন তার জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

আনোয়ারের ভাতিজা মিজানুর রহমান জানান, তার চাচা ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কিছুদিন আগে একটি নতুন প্রকল্পে চাকরি পান। সেখানে যোগদান শেষে বাড়ি ফেরার পথেই দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।

এই বিষয়ে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানান, বেতার বার্তায় দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। মরদেহের বিষয়ে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগমারা থানা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।