কৃষকদের জন্য ডিজিটাল ঋণের বিশেষ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। কৃষকদের ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণ প্রদানের সুযোগ তৈরি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইএফপিআরআই-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে ব্যাংকটি। দুই বছর মেয়াদি এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার কৃষক এবং দেড় হাজার কৃষি উপকরণ বিক্রেতাকে যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পুরো উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করছে গেটস ফাউন্ডেশন। এই বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকরা ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন।
প্রকল্পটির মূল পরিকল্পনা হলো কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস যাচাই করে তাঁদের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা মূল্যায়ন করা। এর ফলে যেসব কৃষক এতদিন মূলত অনানুষ্ঠানিক উৎস বা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতেন, তাঁদের জন্য এখন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার পথ প্রশস্ত হতে পারে।
ব্র্যাক ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চলতি অক্টোবর মাস থেকেই এই উদ্যোগটি শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে ব্যাংকের। এই কার্যক্রম চলবে ২০২৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।
সাধারণত বাংলাদেশের অনেক কৃষক এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পেতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। তাঁদের নিয়মিত আয়ের উৎস, ব্যবসার লেনদেনের হিসাব এবং আর্থিক সক্ষমতার কোনো নির্ভরযোগ্য নথি না থাকায় ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই তাঁদের অনেকেই অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন।
এই সংকট দূর করতে কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের আর্থিক কার্যক্রমের একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা হবে। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা মূল্যায়নের একটি আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘আস্থা’, ‘সাফল্য’ ও ‘জীবিকা’ নামের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ঋণসেবা চালু করা হবে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, শুধুমাত্র ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ পাওয়া যাবে না; ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নির্ধারিত নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্তাবলি প্রযোজ্য হবে। ঋণের কর্মসূচিটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
ডিজিটাল আর্থিক সেবা চালুর পাশাপাশি এই প্রকল্পের কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা হবে। আইএফপিআরআই এই বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করবে, যার মধ্যে দৈবচয়নভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
গবেষণার মাধ্যমে দেখা হবে যে, কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের ডিজিটাল সেবা গ্রহণে কোন বিষয়গুলো প্রভাব ফেলে, এই উদ্যোগটি তাঁদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিসরে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না। গবেষণার এই ফলাফল নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে এবং দেশব্যাপী এই উদ্যোগটি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে।
ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, “কৃষক ও ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক ব্যবসা দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের অনেকেই এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পেতে নানা বাধার মুখে পড়েন। কিন্তু দৈনন্দিন ডিজিটাল লেনদেনকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরির মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগালে কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।”
গেটস ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি প্রোগ্রাম অফিসার স্নিগ্ধা আলী বলেন, “ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে কৃষকদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় পরিবর্তন আসতে পারে।”
আইএফপিআরআই-এর রিসার্চ ফেলো ও প্রকল্পপ্রধান মেহরাব বখতিয়ার বলেন, “বাংলাদেশের অনেক কৃষক এখনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। ডিজিটাল আর্থিক সেবা তাঁদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনে এবং তাঁদের পুরোপুরি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে কী প্রয়োজন, তা এ গবেষণার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হবে।”
এই অংশীদারত্ব চুক্তিতে ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আবদুল মোমেন এবং আইএফপিআরআই-এর মহাপরিচালক জোহান সোয়িনেন।