দেশে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি এর নিরাপত্তা ও নীতিগত কাঠামো শক্তিশালীকরণের ওপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি শক্তিশালী ইন্টারনেট ব্যবস্থা এখন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো ছাড়া ডিজিটাল ফিন্যান্স বা ডিজিটাল অর্থনীতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
আজ শনিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ২.০: নীতিগত লক্ষ্য, লেনদেনের বাস্তুতন্ত্র এবং টেকসই রূপরেখা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী।
ডিজিটালাইজেশন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কিছু সাময়িক বাধা আসতে পারে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এসবের সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সাইবার নিরাপত্তা ও নীতিগত ব্যবস্থা সব সময় কার্যকর থাকবে।
দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি সহজে আন্তলেনদেনযোগ্য (ইন্টার অপারেবল) ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করছে। তবে এটির অপব্যবহার রোধ এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মত দিয়েছেন এই খাতের অংশীজন ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে উদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব মানসিকতার মানুষের অভাব নেই। বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তারা উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, জটিল প্রক্রিয়া, নিয়মনীতি ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা তাঁদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল কাদীর বলেন, বাংলা কিউআর একটি দারুণ প্রযুক্তি। তবে এটির যেন অপব্যবহার না হয়, সে জন্য সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলা কিউআরের জন্য যে নিয়মকানুন নির্ধারণ করেছে, তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
আরেক এমএফএস প্রতিষ্ঠান নগদের চেয়ারম্যান কায়জার আহমেদ চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি বাংলা কিউআর লেনদেনে আন্তলেনদেন ফি (আইআরএফ) শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলা কিউআর উদ্যোগকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ ছাড়া সম্প্রতি কিউআর কোড ব্যবহার এবং লেনদেন হঠাৎ তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার তথ্য এসেছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, কিউআর কোডে লেনদেনে উৎসাহ ধরে রাখতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য সরকার বছরে আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে পারে। কারণ, শুরুতে গ্রাহক বা বিক্রেতা কেউই বাড়তি ফি দিতে আগ্রহী হবেন না। পরে ধীরে ধীরে এই ভর্তুকি সমন্বয় করা যেতে পারে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্মার্টফোনের বিস্তার আটকে থাকার কারণে বাংলা কিউআরের মতো ডিজিটাল সুবিধা মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিতভাবে পৌঁছাতে পারছে না। সাধারণ মোবাইল ফোনে এ সেবা ব্যবহার কঠিন হওয়ায় দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক এর বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলা কিউআরে লেনদেন বাড়াতে শুধু ফি মওকুফ বা নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম চাপিয়ে দিলেই হবে না। সব পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত না করা গেলে মানুষ নগদ লেনদেনের দিকেই বেশি ঝুঁকবে।
ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার তাগিদ
ভিসার কান্ট্রি ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ বলেন, সিএমএসএমই খাতে ঋণ দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থা সময়োপযোগী নয়। এখনো জামানতভিত্তিক ঋণদানের মধ্যে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, যা ব্যয়বহুল ও জটিল। এ খাতের ক্ষমতায়নে সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার প্রয়োজন।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) এমডি মামদুদুর রশীদ বলেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জালিয়াতির ঝুঁকিও বাড়ছে। জালিয়াতি প্রতিরোধ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকার বা বেসরকারি খাতের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ক্ষুদ্রঋণ খাতে সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের তাগিদ দেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুস সাত্তার মণ্ডল, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, ব্যাংক এশিয়ার এমডি আরফান আলী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) এমডি মো. ফজলুল কাদের।