বাংলাদেশের কৃষি খাতের ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রাপ্তির পথ প্রশস্ত করতে যৌথভাবে কাজ করবে ব্র্যাক ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএফপিআরআই। এই যৌথ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো কৃষি খাতের বিভিন্ন স্তরে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো এবং কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় নিয়ে আসা।

ব্র্যাক ব্যাংকের ইমপ্যাক্ট-ড্রিভেন এসএমই ইনোভেশন ল্যাব ‘ফিনোভিশন’-এর অধীনে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে সহায়তা প্রদান করছে গেটস ফাউন্ডেশন।

২০২৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দুই বছর মেয়াদি এই পাইলট প্রকল্পের আওতায় কৃষক এবং কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা হবে। তাঁদের ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস বা ট্র্যাক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা মূল্যায়ন করা হবে। এর ফলে, যারা দীর্ঘকাল ধরে অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে আসছিলেন, সেই কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ পাবেন। এই বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে মোট ৫০ হাজার কৃষক এবং ১ হাজার ৫০০ কৃষি উপকরণ বিক্রেতাকে যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে সদর দপ্তর অবস্থিত আইএফপিআরআই খাদ্যনীতি গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান। এটি আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা অংশীদারত্ব ‘সিজিআইএআর’-এর একটি অংশ হিসেবে কাজ করে।

এই অংশীদারত্বের আওতায় ব্র্যাক ব্যাংক ও আইএফপিআরআই যৌথভাবে ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘আস্থা’, ‘সাফল্য’ ও ‘জীবিকা’ এবং এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ঋণসেবা তৈরি ও চালু করবে। অন্যদিকে, আইএফপিআরআই এই উদ্যোগের সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়নে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করবে। এই গবেষণায় দৈবচয়নভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যার মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা গ্রহণে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো, উদ্যোগটির কার্যকারিতা এবং বৃহত্তর পরিসরে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হবে। গবেষণার এই ফলাফল নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে এবং দেশব্যাপী এই উদ্যোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই অংশীদারত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ব্র্যাক ব্যাংকের অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আবদুল মোমেন এবং আইএফপিআরআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল জোহান সোয়িনেন। অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ব্যাংকের অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব হোলসেল ব্যাংকিং মো. শাহীন ইকবাল উপস্থিত ছিলেন।

আইএফপিআরআইয়ের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র রিসার্স ফেলো কেট অ্যাম্বলার, বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মুগ্ধ মহজাব এবং রিসার্স ফেলো অ্যান্ড প্রজেক্ট লিড মেহরাব বখতিয়ার।

উদ্যোগটি সম্পর্কে সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, “কৃষক ও ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক ব্যবসা দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাঁদের অনেকেই এখনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়েন। দৈনন্দিন ডিজিটাল লেনদেনকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরির মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগিয়ে তাঁদের আর্থিক কার্যক্রমের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া এবং ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা মূল্যায়ন সহজ করা সম্ভব।”

সৈয়দ আবদুল মোমেন আরও বলেন, “এই পার্টনারশিপ ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ও উপযুক্ত অর্থায়ন পাওয়ার মধ্যকার ব্যবধান কমাতে সহায়তা করবে। এর ফলে কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতারা তাঁদের ব্যবসা শক্তিশালী করতে, চলতি মূলধন ব্যবস্থাপনা করতে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন।”

গেটস ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি প্রোগ্রাম অফিসার স্নিগ্ধা আলী বলেন, “বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসারে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও বিশ্বমানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে নিয়ে আসা—এ উদ্যোগ একটি অনন্য প্রয়াস। একজন কৃষকের দৈনন্দিন ডিজিটাল লেনদেন যখন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে, তখন তাঁর জীবিকা ও জীবনের সম্ভাবনাও বদলে যায়। গবেষণালব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এ অংশীদারত্বে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমরা গর্বিত। দেশজুড়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে এ উদ্যোগের।”

আইএফপিআরআইয়ের রিসার্স ফেলো অ্যান্ড প্রজেক্ট লিড মেহরাব বখতিয়ার বলেন, “বাংলাদেশের লাখ লাখ কৃষক এখনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। ডিজিটাল আর্থিক সেবা কৃষকদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনে এবং তাঁদের পুরোপুরি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে কী কী প্রয়োজন, এ অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমরা তা জানার চেষ্টা করব। আমাদের লক্ষ্য হলো, গবেষণার মাধ্যমে এমন তথ্য-প্রমাণ তৈরি করা, যা একটি সফল পরীক্ষামূলক উদ্যোগকে কৃষি অর্থায়নের জাতীয় মডেলে রূপ দিতে সহায়তা করবে।”