উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনার পর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তিলোত্তমা নগরীর দুর্গাপূজার স্বাভাবিক ছন্দ। তবে দুই দিনের শোক কাটিয়ে এবং নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সোমবার মহা অষ্টমীর পুণ্যলগ্নে আবারও শারদীয় উৎসবে মেতে উঠেছেন কলকাতার বাসিন্দারা।

শোকের আবহ কিছুটা কাটলেও এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি নিয়ে এখনও উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গন। ঘটনার দায়ভার কার ওপর বর্তায়, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র তর্কবিতর্ক। বিরোধী দলগুলো এই ঘটনার জন্য রাজ্য সরকারের চরম গাফিলতিকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনায় বিজেপি নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

ঘটনা প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলেছেন, “ব্যর্থতা রাজ্য সরকারের। এই মৃত্যু এড়ানো যেত। সরকার আগে থেকে ব্যবস্থা নিলে এমন ঘটনা ঘটত না।”

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ও বিধায়ক কুণাল ঘোষের দাবি, “এখন লোকদেখানো নাটক শুরু করেছে রাজ্য সরকার। পূজা কমিটির মাথায় যাঁরা আছেন, তাঁদের কেন গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ?”

উল্লেখ্য, ঘটনার পর পুলিশ ইতিমধ্য়েই চোরবাগান পূজা কমিটির চেয়ারম্যান ও বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝাসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার ঠিক আগমুহূর্তে মাইকে দেওয়া একটি ঘোষণাই চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। সে সময় বৃষ্টি শুরু হলে পূজা কমিটির পক্ষ থেকে মাইকে ঘোষণা করা হয়, “প্যান্ডেলের অবস্থা খারাপ, ভেঙে বসে যেতে পারে। আপনারা সবাই দ্রুত বেরিয়ে যান, পদপিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।” এই সতর্কবার্তা শোনার পর মণ্ডপে উপস্থিত দর্শনার্থীরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করেন। এর ফলে ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে শিশুসহ ১৯ জনের করুণ মৃত্যু হয়। দর্শনার্থীদের আরও অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক উপস্থিত ছিলেন না।

এমন শোক ও রাজনৈতিক বিতর্কের আবহেই সোমবার উদ্‌যাপিত হয় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের মহা অষ্টমী। রাজ্যজুড়ে এবার মোট ৫৭ হাজার ৪০০টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গত বছর মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পূজামণ্ডপের সংখ্যা একলাফে ১২ হাজার ৪০০টি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর আর্থিকভাবে দুর্বল পূজা কমিটিগুলোকে ১ লাখ রুপি করে অনুদান দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তবে বড় বাজেটের প্রায় ২০০টি পূজা কমিটি সরকারি সহায়তা প্রত্যাখ্যান করায় সেই অর্থ দুর্বল কমিটিগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছর অনুদানের পরিমাণ ছিল কমিটিপ্রতি ১ লাখ ১০ হাজার রুপি।

দুর্ঘটনার কালো ছায়া থাকলেও বরাবরের মতোই এবারও কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার পূজায় থিমের লড়াইয়ে কোনো কমতি নেই। বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে চলছে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। এ বছর মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতার বালিগঞ্জ সমাজসেবী সংঘ, রাসবিহারীর লেক ইয়ুথ কর্নার এবং টালিগঞ্জের তিলকনগর সর্বজনীন বিশেষ থিম তৈরি করেছে। এছাড়া আরজি কর হাসপাতালের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের (অভয়া–কাণ্ড) প্রতিবাদী রূপ ফুটিয়ে তুলেছে নরেন্দ্রপুর এলাচি রামচন্দ্রপুর সর্বজনীন ও টালিগঞ্জ নেতাজি জাতীয় সেবাদল। অন্যদিকে, ঝাড়গ্রামের গিধনী স্পোর্টিং ক্লাবের মণ্ডপে স্থান পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লোকসভা নির্বাচনী প্রচারের সময় স্থানীয় এক মহাসড়কের পাশের দোকান থেকে ১০ টাকার ঝালমুড়ি খাওয়ার বাস্তব দৃশ্যটি।

এদিকে কলকাতার সেরা পূজামণ্ডপ নির্বাচনে সরেজমিন সমীক্ষা চালিয়ে সাতটি মণ্ডপকে সম্মাননা দিয়েছে আনন্দবাজার ডটকম। সেরা সাতটি মণ্ডপ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে—উত্তর কলকাতা সর্বজনীন, নাকতলা উদয়ন সংঘ, আলিপুর সর্বজনীন, দমদম পার্ক ভারত চক্র, সল্টলেকের এফডি ব্লক, বেহালা ইয়ংমেন্স অ্যাসোসিয়েশন ও দমদম পার্ক তরুণ সংঘ।