উত্তর কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসবে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। কারণ, চোরবাগান দুর্গোৎসবের প্রধান উদ্যোক্তাদের তালিকায় খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাতিজা দেবদীপ অধিকারীর নাম রয়েছে, যা পূজা কমিটির প্রকাশিত একটি পোস্টারের মাধ্যমে সামনে এসেছে।

উক্ত পোস্টারে দেবদীপ অধিকারীর নাম ‘চিফ প্যাট্রন’ বা প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এই পূজা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষও এই পুজোর সাথে সরাসরি জড়িত বলে জানা গেছে।

শনিবারের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে বিজেপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, এত বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর জন্য প্রকৃত দায়ী কে? পাশাপাশি এমন এক মর্মান্তিক ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী কবে পদত্যাগ করবেন, তা জানতে চেয়েছে দলটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পূজা কমিটির ওই পোস্টার শেয়ার করে আক্রমণ শাণিয়েছে তৃণমূল। উল্লেখ্য, চোরবাগান পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

রোববার দুপুরে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, ‘প্রথম তিনটি নামের বিরুদ্ধে কি কলকাতা পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেবে, নাকি অবৈধ মুখ্যমন্ত্রী নিজেই তাঁদের আড়াল করছেন? দেবদীপ অধিকারী-প্রধান পৃষ্ঠপোষক, শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো, বিজয় ওঝা-পুজোর চেয়ারম্যান এবং বিজেপির বিধায়ক ও তন্ময় ঘোষ পুজোর প্রধান উপদেষ্টা এবং বিজেপি জেলা সভাপতি, উত্তর কলকাতা।’ তৃণমূলের আরও প্রশ্ন, ‘তারা কি সমানভাবে দায়ী নয়? মুখ্যমন্ত্রী নিজে চোরবাগান পূজা প্যান্ডেলের উদ্বোধন করেছিলেন, প্যান্ডেলে যাওয়ার সময় কি তিনি নিরাপত্তার ব্যবস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখেননি? হারানো প্রতিটি প্রাণের জন্য কি তাঁকে দায়বদ্ধ করা হবে না।’

অন্যদিকে, শনিবার রাতেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দৃঢ় অঙ্গীকার করে জানিয়েছেন যে, এই দুর্ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে দুর্ঘটনার সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ফুটেজে যাঁদের গাফিলতি ধরা পড়বে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশনার পর রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির একাধিক কর্মকর্তা, ভিআইপি পাস ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং দুই বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। তবে পোস্টারে নাম থাকা সত্ত্বেও গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকায় দেবদীপ অধিকারীর নাম নেই। একইভাবে তালিকায় নেই বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা কিংবা দলের উত্তর কলকাতা জেলা সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের নামও।

দুর্ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনা তাঁর জানা নেই। মুখ্যমন্ত্রীর ভাতিজা নাবালক না সাবালক কিংবা তিনি কলকাতায় থাকেন কি না, সে বিষয়েও তাঁর কোনো তথ্য নেই। পাশাপাশি তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত থাকার কথা জানিয়ে সেই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

শনিবারের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন, যাঁরা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার সকালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে আহতদের অবস্থা খতিয়ে দেখেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে দুর্গাপূজা উপলক্ষে তাঁর নির্ধারিত সব কর্মসূচি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য হাইকোর্টের বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠনের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সরকারি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।