মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম দল তারা, যারা তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন। দ্বিতীয় দল তারা, যারা তাঁকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। আর এই দুই বিপরীত মেরুর মাঝখানে অবস্থান করি আমার মতো কিছু মানুষ, যাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ যেন এলাকার সেই অত্যন্ত মেধাবী বা 'ট্যালেন্টেড' বড় ভাই। আমাদের মনে হয়, সঠিক সুযোগ পাওয়া গেলে আমরাও হয়তো তাঁর মতো বা তাঁর চেয়েও ভালো লিখতে পারতাম। কেবল সুযোগের অভাব ছিল, আর সেই সুযোগের শূন্যতাতেই রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যচর্চা করে নোবেল পুরস্কার জয় করে নিয়েছেন।

একবার রবীন্দ্রনাথের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল প্রথম শ্রেণির একজন ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, "আপনার প্রিয় সাহিত্যিক কে?"

আমি অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে উত্তর দিয়েছিলাম, "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!"

আমার কথা শুনে তিনি বেশ অবাক হন এবং আগ্রহের সাথে জানতে চান, "কেন বলুন তো! এই জেনারেশনের কাউকে আমি বলতে শুনিনি, রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় সাহিত্যিক!"

আমি আমার গাম্ভীর্য আরও বাড়িয়ে উত্তর দিলাম, "মাঝেমধ্যেই আমার ঘুমের সমস্যা হয়। রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না। তখন রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়ি। ঝিমানি টাইপ গান। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ঘুম চলে আসে।"

এই উত্তরের পর ওই ভদ্রলোক আমার সাথে দ্বিতীয়বার কথা বলেননি। পরবর্তীতে রাস্তায় দেখা হলেও তিনি এমনভাবে আমাকে এড়িয়ে যেতেন, যেন আমি কোনো অপরাধী বা ক্রিমিনাল!

অন্যদিকে, তৃতীয় শ্রেণির মানুষের অভিযোগের কোনো শেষ নেই। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো, রবীন্দ্রনাথ নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামনা করেননি। ফেসবুকের অনেক স্বঘোষিত ইতিহাসবিদের মতো আমার এক দূরসম্পর্কের মামারও বিশ্বাস এই কথা। আমি যখন তাঁকে এই তথ্যের উৎস জিজ্ঞেস করলাম, তখন তিনি জানালেন যে, তিনি এটি এক মুরুব্বির কাছ থেকে শুনেছেন। আর সেই মুরুব্বি তাঁর সারা জীবনে একটি মিথ্যা কথাও বলেননি। এমন অকাট্য যুক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তর্কে যাওয়ার কোনো মানে হয় না, তাই আমি আর কথা বাড়াইনি।

রসিকতার পাশাপাশি এবার কিছু গুরুত্বের কথা বলা যাক। কয়েক বছর আগে আমি 'পেটেভাতে'র বিজ্ঞাপনের কপি লিখতাম। একটি সৃজনশীল লাইন খুঁজে পেতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হতো। যখন মাথা একদম শূন্য হয়ে যেত, তখন আমি রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করতাম। কারণ, অনুরোধে বা অন্য কোনো কারণে রবীন্দ্রনাথ নিজেও অনেক বিজ্ঞাপনের কপি ও জিঙ্গেল লিখেছেন। সুলেখা কালির বিজ্ঞাপন লিখতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন—‘সুলেখা কালি। এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।’

যে মানুষটি একটি বিজ্ঞাপনের কপিও এত চমৎকারভাবে লিখতে পারেন, তাঁকে ভালো না বেসে উপায় কী! তাই রবীন্দ্রনাথকে কেবল 'গুরুদেব' হিসেবে কোনো দূরবর্তী উচ্চাসনে বসিয়ে না রেখে, আমি তাঁকে আমার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করি। তিনি আমার কাছে এমন একজন আপন মানুষ, যাঁর গান শুনে সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে শান্তিতে ঘুমানো যায়। বর্তমান দেশের পরিস্থিতিতে শান্তিতে একটুখানি ঘুমানো যে কতটা কঠিন, তা তো সবারই জানা।

—বি.এস