চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন অশুভ শক্তির তাণ্ডব, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাপ্রবাহ বাচায়ে সাকাও ওরফে কাবুলি হাবিবুল্লাহ কালাকানিকেও লজ্জা দিচ্ছিল, তখন অনেকের মনেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল তাজউদ্দীন আহমদের স্মারক ভাস্কর্যটি নিয়ে। গাজীপুরের কাপাসিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার তাজউদ্দীন আহমদ চত্বরে, ফকির মজনু শাহ সেতুর পশ্চিম পাশে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই ভাস্কর্যটি। সেই উত্তাল সময়ে আমি বাজি ধরেছিলাম, দিনের আলোতে বা প্রকাশ্যে কেউ এটি ভাঙতে পারবে না। যত বড় বাচায়ে সাকাওই আসুক না কেন, স্থানীয় মানুষ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে বাধা দেবে।

তাজউদ্দীন আহমদের ব্যক্তিগত রোজনামচায় তাঁদের নাম লেখা আছে। গান্ধী, জিন্নাহ, সোহরাওয়ার্দী, লিয়াকত, ভাসানী, নাজিমুদ্দীন, আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন বুদাই দফাদার, হাসির বাপ, রাবিয়ার মা, মিয়ার বাপ, আনুর মা, মোতালিব দর্জি, খাজার বাপ, সিরাজের মা, জয়নার বাপ, রমিজার মা, গহর আলী গাড়িয়াল, হরিমোহন, লস্কর বেপারী, ফটিক, বড় বেপারী, রহমত পণ্ডিত, হারা জোগাল, রাম ভাওয়ালি, বলাই বাবু, ধনাই বেপারীসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষের নাম।

তাঁরা ছিলেন বিভিন্ন বয়স, পেশা এবং সামাজিক শ্রেণির মানুষ। কারও পদবি দেখে হয়তো তাঁর পেশা বা ধর্ম সম্পর্কে ধারণা করা যায়, কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদের কাছে তাঁরাই ছিলেন সবচেয়ে কাছের মানুষ। শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান, মান-মর্যাদা কিংবা ক্ষমতা-প্রতিপত্তির বিচারে গান্ধী, জিন্নাহ, সোহরাওয়ার্দী, লিয়াকত বা খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে হারা জোগাল, রাম ভাওয়ালি, বলাই বাবু বা ধনাই বেপারীদের কোনো তুলনা চলে না। তাঁদের জীবনজগত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তা সত্ত্বেও এই সাধারণ মানুষদের কথা তিনি সবসময় মনে রেখেছেন।

রোজনামচা লিখতে বসে অসাধারণ মুনশিয়ানায় তিনি তাঁদের মুখগুলো ধরে রেখেছেন এবং বর্ণনা করেছেন তাঁদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ। তাঁর কাছে কেউই অপেক্ষা কিংবা উপেক্ষার পাত্র ছিলেন না। তিনি স্থানীয় সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা থেকে আলাদা করে দেখতে চাইতেন না; বরং মনে করতেন, স্থানীয় সমস্যার মধ্য দিয়েই জাতীয় সমস্যাকে বুঝতে হবে এবং তার সমাধান খুঁজতে হবে।

তাই আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ মোন্দরের বাপ, খামি বেপারী, ধনাই বেপারী, রঙ্গু, জাহার বাপ, জহুরা, কাগু, হুদাইদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, কাজকর্ম ও ওঠাবসার কথা প্রতিদিন লিখে রাখতেন। ভাবতেন তাঁদের মুক্তির পথ নিয়ে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে তখন দেশের সর্বময় কর্তা জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর কথা শোনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছিল গ্রামের কৃষিজীবী মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা শোনা এবং তা সমাধানের চেষ্টা করা।

তাজউদ্দীন যখন মাত্র ১৭-১৮ বছরের কিশোর, তখন পঞ্চাশের মন্বন্তরে বাংলা এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের চাপে থমকে গিয়েছিল। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি অন্য কিশোরদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য গড়ে তোলেন ‘পল্লী মঙ্গল সমিতি’।

বর্তমান সময়ে কিশোরদের সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং অনেক সময় ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ তকমা দেওয়া হয়। অথচ সেই সময়ে কিশোরদের উদ্যোগেই ধর্মগোলা স্থাপিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ফসল কাটার সময়ে ধনী কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে গোলায় রাখা। এই উদ্যোগকে কেউ চাঁদাবাজি মনে করেননি, বরং সবাই একে একটি মহৎ আপৎকালীন ব্যবস্থাপনা হিসেবে গ্রহণ করে শরিক হয়েছেন। মানুষ বিশ্বাস করেছিল কিশোর তাজউদ্দীন ও তাঁর সাথিদের। কোনো পূর্ব উদাহরণ ছাড়াই কেবল লোকজ চর্চাকে সম্বল করে তাঁরা এগিয়েছিলেন এবং সাধারণ মানুষও সেই অভিনব পথচলায় সাড়া দিয়েছিল।

যুদ্ধের সময়ে কলকাতার থিয়েটার রোডের অফিসে তাঁর কৃচ্ছ্রসাধনের কথা অনেক স্মৃতিকথায় লেখা হয়েছে। তবে তাঁর এই সাদাসিধে জীবনযাপন কেবল যুদ্ধের সময়ের জন্য ছিল না, বরং এটাই ছিল তাঁর স্বাভাবিক জীবনধারা। ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন ‘ডাল-ভাতের তাজউদ্দীন’।

রাজনীতি, পড়াশোনা বা উপার্জনের প্রয়োজনে তাঁকে ঢাকায় আসতে হতো, শহরে থাকতে হতো। কিন্তু তাঁর মাথায় সবসময় থাকত এলাকার মানুষের হাজারো কাজ। একুশে ফেব্রুয়ারি তিনি শ্রীপুরে আটকা পড়েছিলেন, ফলে সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারেননি। সকালের প্রথম ট্রেন মিস হওয়ায় তিনি দুপুরের ট্রেন ধরেন। ভাষা আন্দোলন তখন তুঙ্গে, প্রতি ঘণ্টায় পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছিল, তাই তাঁর ঢাকায় আসা জরুরি ছিল। পাশাপাশি গ্রামের স্কুলের কাজে তাঁকে এসডিও অফিস ও ডিপিআইয়ের দপ্তরেও ছুটতে হতো।

ট্রেন থেকে নেমে তিনি জানতে পারেন পুলিশ অত্যন্ত মারমুখী আচরণ করছে। তখনো গুলি চলেনি, তবে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ছুটে যান আহতদের খোঁজ নিতে। সেখান থেকেই আবার স্কুলের কাগজপত্র নিয়ে ছুটেন এসডিওর এজলাসে এবং ডিপিআই অফিসে।

তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং আন্দোলন তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাঁকে ভরসা করে স্কুলের যে দায়িত্ব দিয়েছিল, তা তিনি ভুলতে পারেননি। সরকারি অফিসের সময় মেনে কাগজপত্র জমা দিয়ে তিনি দ্রুত ফজলুল হক হলে পৌঁছান। সেখানে ছাত্রদের সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এবং পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করেন। ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে লিফলেট সংগ্রহ করে রেলস্টেশন, নারিন্দা, সদরঘাট, পাটুয়াটুলি হয়ে নবাব গেট পর্যন্ত বিলি করেন। এই দুই বিপরীতমুখী কাজের প্রতিই তাঁর দায়বদ্ধতা ও দরদ ছিল সমান।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ড. আবদুল মতিন তাঁর ‘আ প্যাসেজ টু ফ্রিডম’ বইয়ে তাজউদ্দীনের এই সাদাসিধে জীবনযাপনের সাক্ষ্য দিয়েছেন। ড. আবদুল মতিন স্কুলজীবনের কয়েক মাস বড় ভাইয়ের রুমমেট হিসেবে তাজউদ্দীনদের ফজলুল হক হলের এন-১২ নম্বর কক্ষে ছিলেন এবং তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “তাজউদ্দীন আহমদ খুবই সাধারণ কিন্তু শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপন করতেন। সাধারণত তিনি পায়জামা ও শার্ট পরতেন। নিজের কাপড়চোপড় নিজেই ধুতেন। সকালে তিনি চিড়া, গুড় ও কলা খেতেন। ১৯৫৩ সালে আমি আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হলে বড় ভাই ও আমি স্কুলের কাছাকাছি একটি বাড়িতে চলে আসি।”

তাজউদ্দীন আহমদ আর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা নিয়মিত ড. মতিনের বাড়িতে আসতেন এবং একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করতেন। তাজউদ্দীন একবার তাঁর ভাইকে বলেছিলেন, “তোমরা এত চ্যাপ্টা প্লেটে ডাল-ভাত পরিবেশন করো কেন? আমাকে বরং স্যুপ খাওয়ার বাটিতে খেতে দাও, তাতেই আমি ডাল-ভাত খাব। চ্যাপ্টা প্লেটে চপ বা কাটলেট মানায়। আমি ওসব পছন্দ করি না।”

তাজউদ্দীনের সাধারণ পোশাকের যে বর্ণনা ড. মতিন দিয়েছেন, সেই পোশাক বদলানোর প্রয়োজন মনে করেননি সাধারণের তাজউদ্দীন। যে পোশাকে শহরে আসতেন, সেই পোশাকেই গ্রামে যেতেন। তাঁর পোশাক সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোনো দূরত্ব তৈরি করত না, যেমন দূরত্ব তৈরি করত না তাঁর ইংরেজি জ্ঞান কিংবা ইংরেজিতে রোজনামচা লেখার অভ্যাস। তিনি ছিলেন এক ও অভিন্ন মানুষ, যার মধ্যে কোনো ভণিতা বা অভিনয় ছিল না।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, “খ্যাতিমান অ্যাডভোকেটের বসবার ঘরে বসে তিনি যেভাবে আলাপ করেন, তেমনি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে জমির আলে, পাটখেতের পাশে, কৃষিজমিতে দাঁড়িয়ে কথা বলাতে। গ্রামে যারা জমির মালিক, তারাও জমিতে ফসলের চারা লাগান, পাটখেতে নিড়ানি দেন, মরিচের খেতে আগাছা পরিষ্কার করেন। এদের সঙ্গে তো অবশ্যই, যে চাষি হাল চাষ করছে, যে করাতি কাঠ কাটছে, তাদের সঙ্গেও তাজউদ্দীনের আলাপ হয়।

বাড়ির বৈঠকখানায় যখন সবাই মিলে খাবার খেতে বসেন, তখন গৃহভৃত্যদের ডেকে নেন পাশে। কোনো পক্ষেই সংকোচ দেখা যায় না। এটা কোনো স্ববিরোধিতা নয়, দ্বৈত চরিত্রে অভিনয়ও নয়। এ হচ্ছে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তাঁর কাছে গ্রাম ও শহর যেন একই গৃহস্থের অন্দরমহল ও বাইরের ঘর।”

প্রশাসক হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের দক্ষতা বোঝার জন্য মনে রাখা প্রয়োজন যে, তিনি কেবল বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না; মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের নেতৃত্ব এবং স্বাধীনতার পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে অত্যন্ত কঠিন প্রশাসনিক পরিস্থিতি সামলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করা আমলাদের স্মৃতিচারণায় তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কথা পাওয়া যায়, যদিও সবাই সব বিষয়ে একমত ছিলেন এমন প্রমাণ নেই।

সাবেক অর্থসচিব কাফিলউদ্দিন মাহমুদ, সাবেক অর্থসচিব মতিউল ইসলাম, সাবেক ব্যক্তিগত সচিব আবু সাঈদ চৌধুরী এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ডেপুটি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের স্মৃতিচারণায় তাজউদ্দীনের সততা, সরলতা, পরিশ্রম, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার কথা উঠে এসেছে।

মন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশে চলতে পছন্দ করতেন না। একবার এক অতি উৎসাহী জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, “দয়া করে আমাকে বলবেন না, আমার কী করা উচিত। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো, আমার সামনে বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরা এবং প্রতিটির ভালো ও মন্দ দিক ব্যাখ্যা করা। সিদ্ধান্তটা আমাকে নিজেকেই নিতে দিন।”

ভবিষ্যৎবাণী বা পরিস্থিতি বুঝতে পারার ক্ষমতা তাঁর অসাধারণ ছিল। তাই ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দী হতবিহ্বল সহকর্মীদের তিনি সহজেই বলতে পেরেছিলেন, “অজু করে নিন, কালেমা পড়ুন।”

আমাদের হতবিহ্বলতা কবে কাটবে?

গওহার নঈম ওয়ারা
লেখক ও গবেষক
[email protected]