কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে কয়েক শ মানুষের বিক্ষোভ এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে বিএনপি ও যুবদল নেতাদের হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। যুবদল কর্মী আবু কাউছারের হত্যা মামলার এজাহারে আসামিদের নামের তালিকা গ্রহণে পুলিশের গড়িমসির অভিযোগে আজ রোববার দুপুরে এই উত্তেজনা তৈরি হয়।
থানার ভেতরে উত্তপ্ত পরিস্থিতির এক পর্যায়ে ওসিকে উদ্দেশ্য করে কুমিল্লা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান বলেন, ‘কারও কথায় মামলা হইত না। দরকার হইলে আমরা এমপি-মন্ত্রীরে আনামু।’
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আবু কাউছারকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত কাউছার কুমিল্লা নগরের কাপ্তানবাজার এলাকার আবদুল মান্নানের ছেলে এবং কুমিল্লা মহানগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যদিও তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক পদ-পদবি ছিল না। এর আগে তিনি কুমিল্লার দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কাউছারের হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার রাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদুল ইসলাম ওরফে তৌহিদ (৩৫) এবং তাঁর বড় ভাই তানজির আলমকে (৪৮) গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনার পর শনিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, ‘যুবদল নেতা কাউছার হত্যার ঘটনায় তাঁর ভাইয়ের করা মামলা কোতোয়ালি মডেল থানায় রুজু হয়েছে। মামলায় মূল ঘাতক তৌহিদসহ দুজন এজাহারনামীয় আসামি।’
পুলিশ সুপারের এই বক্তব্যের পর আজ দুপুরে নিহত কাউছারের ভাই কবির হোসেনের দেওয়া এজাহার গ্রহণের দাবিতে কয়েক শ মানুষ থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নারীদের হাতে ঝাড়ু দেখা যায়; তাঁরা ঝাড়ু উঁচিয়ে হত্যার বিচার এবং প্রকৃত আসামিদের নাম এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
একই সময়ে নিহত কাউছারের স্বজন এবং কুমিল্লা জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা ওসির কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটি ও হট্টগোল শুরু হয়, যা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন কয়েকজন বিএনপি নেতা। ওসির কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিহত আবু কাউছারের বড় ভাই ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহসভাপতি কবির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত দুই দিন মামলার জন্য ঘুরতে ঘুরতে আমি ক্লান্ত। আমার ভাই মারা গেছে, আমি বিচার পাইতেছি না। তার সন্তানদের কান্না আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার মামলা নিচ্ছে না পুলিশ।’
মামলা না নেওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে কবির হোসেন বলেন, ‘মামলা কেন নিচ্ছে না, এটা পুলিশ জানে।’ এসময় পাশে থাকা এক ব্যক্তির মন্তব্য শোনা যায় যে, এই মামলা নিয়ে তদবির শুরু হয়েছে।
কবির হোসেনের সঙ্গে ওই সময় ওসির কক্ষে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাহিদ চৌধুরী, মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলামসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। এসময় খলিলুর রহমানকে ওসির উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘যারা দায়িত্বে আছে, তারা আমরার তৈরি। এত কথা কইয়া লাভ নাই। তারারে কন আমরা কইছি। কে আছে, তারারে কন আমরা কইছি। কারও কথায় মামলা হইত না। দরকার হইলে আমরা এমপি-মন্ত্রীরে আনামু।’
এর বিপরীতে পাশে থাকা এক ব্যক্তির মন্তব্য শোনা যায়, ‘মামলা এমপি–মন্ত্রীর কথায় হইব নাকি? মামলা হইব বাদীর অভিযোগের ভিত্তিতে।’
পরে বিকেলে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে খলিলুর রহমান জানান, কবির হোসেন পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে গতকাল থেকে চেষ্টা করছিলেন। পুলিশ প্রথমে গ্রেপ্তারকৃত দুই ভাইয়ের নামেই মামলা করে তদন্তের মাধ্যমে অন্য আসামিদের শনাক্ত করার কথা বলছিল, যা নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত কবির হোসেনের এজাহার অনুযায়ী পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা দ্রুত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক নেতা মুক্তকণ্ঠকে জানান, প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদ আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ সাতটি মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তৌহিদ ছয় মাস কারাগারে ছিলেন। সম্প্রতি তাঁকে একটি অনুষ্ঠানে দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক শীর্ষস্থানীয় নেতাকে ফুল দিয়ে বরণ করতে দেখা গেছে, যা নিয়ে দলীয় মহলে সমালোচনা চলছে। ওই নেতার অভিযোগ, তৌহিদ ও তাঁর ভাইকে মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিতে সহায়তাকারী ব্যক্তিদের নাম এজাহার থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এলাকাবাসী ও বিএনপি নেতাদের প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে।
বিক্ষোভ ও হট্টগোলের পর বেলা আড়াইটার দিকে কবির হোসেনের দেওয়া এজাহার গ্রহণ করে পুলিশ। এই মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারনামীয় বাকি তিন আসামি হলেন তৌহিদের বাবা খোরশেদ আলম ওরফে মো. হাবিব (৭০), ডুমুরিয়া চাঁনপুর এলাকার সাইফুল ইসলাম সুমন (৪০) এবং শ্রীপুর (মাঝিগাছা) এলাকার ফরহাদ হোসেন (২৮)।
আজ বিকেল পৌনে চারটার দিকে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গতকাল আমরা মামলার কোনো এজাহার পাইনি। আমরা ভিকটিম পক্ষকে পরামর্শ দিয়েছি, যেহেতু দুজন আসামি আটক আছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মামলা করতে।’
তিনি আরও জানান, আজ দুপুরে কিছু লোক থানার সামনে জড়ো হন এবং সেই সময় আবু কাউছারের ভাই এজাহার নিয়ে এলে সেটির ভিত্তিতে মামলা করা হয়। মামলায় পাঁচজন নামীয় এবং তিন থেকে চারজন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে। তৌহিদ বর্তমানে হাসপাতালে আছেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে; তানজিরকে দ্রুত আদালতে পাঠানো হবে।
এদিকে, গ্রেপ্তারকৃত তৌহিদুল ইসলাম ওরফে তৌহিদ ও তানজির আলমের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে কুমিল্লার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফরহাদ রায়হান ভূঁইয়া সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সন্ধ্যায় ওসি তৌহিদুল আনোয়ার মুক্তকণ্ঠকে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, আদালতের আদেশের পর দুই আসামিকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।