কুমিল্লার পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি জমিতে রিসোর্ট নির্মাণ নিয়ে বিরোধের জেরে যুবদল নেতা মো. আবু কাউছারকে (৪৩) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদ ও তার ভাই তানজিরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।

পুলিশ সুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যে জমিটি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল তা মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন। গ্রেপ্তারকৃত তৌহিদ পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন যে, তারা ওই জমিতে একটি রিসোর্ট নির্মাণের চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু শামীম এবং তার বন্ধু কাউছার এতে বাধা প্রদান করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। শুক্রবার রাতে বিষয়টি মীমাংসার জন্য একটি বৈঠকের কথা নির্ধারিত থাকলেও তার আগেই সকালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৌহিদ, তার ভাই ও সহযোগীরা হামলা চালান। এই নৃশংস হামলায় আবু কাউছার নিহত হন।

পুলিশি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা নগরের গোমতী নদীর উত্তর পাড়ে অবস্থিত ছত্রখিল এলাকায় কাউছারকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এই হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার গভীর রাতে নগরের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নূরপুর এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করে। একই রাতে তার ভাই তানজিরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে গ্রেপ্তার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১১)। গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তি কুমিল্লা সদর উপজেলার আমড়াতলি ইউনিয়নের নন্দিবাজার এলাকার খোরশেদ আলমের সন্তান। তৌহিদের বয়স ৪৩ বছর এবং তানজিরের বয়স ৪৭ বছর। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, তৌহিদের বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলা রয়েছে এবং তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।

নিহত কাউছারের বন্ধু শামীম হোসেন জানান, ছত্রখিল এলাকার একটি জমি নিয়ে তৌহিদ ও তানজিরের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। তিনি দাবি করেন, জমিটি তিনি কিনেছিলেন, কিন্তু দখল নিতে গেলে বাধার মুখে পড়েন। এছাড়া কেনা জমিতে প্রবেশের পথ বন্ধ করে সামনের মসজিদের খাসজাগয়া দখল করে কফিশপ চালানোর অভিযোগও তোলেন তিনি।

শামীমের অভিযোগ, জমির বিরোধ মীমাংসার কথা বলে শুক্রবার তাদের ডেকে নেন তৌহিদ। এরপর শামীম ও কাউছারসহ তিন-চারজন একটি অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাদের পেছনে আরেকটি অটোরিকশায় আরও কয়েকজন আসছিলেন। তবে কাউছারদের বহনকারী অটোরিকশাটি আগে পৌঁছায়। এরপরই তৌহিদের নেতৃত্বে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। শামীমের দাবি, তৌহিদ ধারালো দা দিয়ে কাউছারের গলা ও ঘাড়ে কোপ দেন, যার ফলে তিনি গুরুতর আহত হন। এরপর তৌহিদ, তানজিরসহ অন্যরা মোটরসাইকেলে করে দ্রুত পালিয়ে যান।

নিহত আবু কাউছার কুমিল্লা নগরের কাপ্তান বাজারের ব্যাপারী পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং এর আগে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বড় ভাই কবির হোসেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহসভাপতি হিসেবে কর্মরত।

কুমিল্লা মহানগর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান জানান, কাউছার সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কুর অনুসারী ছিলেন। খলিলুর রহমানের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার তৌহিদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, “৫ আগস্টের পর তৌহিদের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং ঢাকায় গ্রেপ্তারের পর তিনি ছয় মাস কারাগারে ছিলেন।”

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, তৌহিদ ও তানজিরকে গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পরিবার মামলা দায়ের করেছে। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।